অসুস্থ সেন্টমার্টিন হাসপাতাল!

তারেকুর রহমান,  সেন্টমার্টিন থেকে ফিরে:

যেখানে একটি হাসপাতাল অসুস্থ সেখানে অসুস্থ রোগীদের সুস্থ করে তুলাই যেন আষাঢ়ে গল্প। ১০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল ইমারত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, নেই তার ব্যবহার, নেই কোন ডাক্তার। অপারেশন থিয়েটার রুমে মরিচা ধরে বন্ধ তালায়। দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ এবং অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র সেন্টমার্টিন হাসপাতালের করুণাবস্থা। নেই চিকিৎসক, নেই চিকিৎসা সুবিধা। এককথায় অসুস্থ এই হাসপাতাল। এ নিয়ে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে স্থানীয়রা ও দূর-দূরান্ত থেকে আগত হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়া পর্যটকরা। প্রতিদিন হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটকদের পদভারে মূখরিত দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন পর্যটনের জন্য বিশ্বব্যাপী সুনাম অর্জন করলেও দ্বীপে গড়ে ওঠেনি কাঙ্ক্ষিত সেবা প্রতিষ্ঠান। ডাক্তার, নার্সসহ অন্যান্য জনবলের অভাবে এখানকার ১০ শয্যার হাসপাতালটি দীর্ঘদিন ধরে অচলাবস্থায়। ফলে দ্বীপের প্রায় সাড়ে ৮ হাজার বাসিন্দার স্বাস্থ্যসেবা বড়ই নাজুক। হাতেগোনা কয়েকটি ছোট ফার্মেসির ওপরই তাদের নির্ভর করতে হয়। গুরুতর দুর্ঘটনা বা অসুস্থ হলে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা অথবা আল্লাহর ওপর ভরসা ছাড়া কোনো উপায় নেই বলে জানালেন দ্বীপের বাসিন্দারা। স্থানীয় ইউপি সদস্য হাবিবুর রহমান খান বলেন, শুধু পর্যটক কেন্দ্র হিসেবে নয় শিক্ষাদীক্ষার দিকদিয়েও সেন্টমার্টিন এগিয়ে যাচ্ছে। সচেতন নাগরিক হয়ে বেড়ে উঠা শিক্ষার্থীদের কাছে আজ অভিভাবক সমাজ প্রশ্নবিদ্ধ, কেন চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত সেন্টমার্টিনের বাসিন্দারা! শিক্ষার্থীসহ স্থানীয়দের মতে, মানুষের মৌলিক চাহিদার মধ্যে চিকিৎসাসেবা অন্যতম। দ্বীপবাসীর চিকিৎসাসেবার জন্য এতো বড় হাসপাতাল গড়ে উঠলেও নেই চিকিৎসক। বর্তমান সরকার প্রতিটি মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ঘোষণা দিলেও চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত রয়েছে দ্বীপের প্রায় সাড়ে ৮ হাজার বাসিন্দা। তিনি আরো বলেন, বিনা চিকিৎসায় প্রতি বছর সেন্টমার্টিন দ্বীপে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এরপরও কর্তৃপক্ষের কোনো নজর নেই। সম্প্রতি চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে অনেককে। কোন প্রসূতি রোগী ও শিশুর অবস্থা আশঙ্কাজনক হলে এখানে চিকিৎসা না পেয়ে ট্রলারে করে টেকনাফে নিয়ে যাওয়ার পথে মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুবরণ করেছে এই রকম দৃষ্টান্ত অহরহ। দ্বীপবাসীরা প্রশ্ন তুলেন, সরকারি চিকিৎসক দ্বীপে পাঠালেও কেন অবস্থান করেন না? তারা কি সরকারের বেতনভুক নয়। সরেজমিনে সেন্টমার্টিন হাসপাতাল পরিদর্শন করে দেখা যায় রোগী থাকলেও ডাক্তার নেই। তালাবদ্ধ হাসপাতালের চতুর্দিক ঘুরে কোন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দেখা যায়নি। অবশেষে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় খুঁজে পাওয়া গেল উক্ত হাসপাতালের কথিত উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার ডা: সৈকত হাসানকে। তিনি বলেন, ২০০২ সালে ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন ও ২০০৯ সালে উদ্বোধনকৃত এ হাসপাতালের রেজিষ্টার বইতে সরকারি-বেসরকারি ৭ জন মেডিকেল অফিসার, ২জন এমবিবিএস এবং ১জন এমএলএস থাকার কথা থাকলেও আমি একজন ছাড়া কেউ নেই। ডা: দস্তগীর নামের এক এমবিবিএস যোগদান করলেও তিনি টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিনে আসেননি। রোগীর অবস্থা খুব বেশি নাজুক হলে মাঝে মাঝে ডা: শহিদুল আলম দেখেন বলেও তিনি জানান। ভুক্তভোগী স্থানীয় মহিলা সমজিদা খাতুন জানান, আমার বাচ্চার ৭-৮ বার নিউমোনিয়া হলে চিকিৎসাসেবার জন্য এ হাসপাতালে আনা হয় কিন্তু ডাক্তারের দেখা পায়নি একবারও। অবশেষে ট্রলার করে টেকনাফ নিয়ে যেতে হয়েছে এতে করে আমার অনেক টাকা খরচ হয়েছে, কষ্টও হয়েছে। যদি এখানে ডাক্তার থাকতো তাহলে আমরা চিকিৎসাসেবা পেতাম, দূরে গিয়ে কষ্ট করে চিকিৎসা নিতে হতো না। খোঁজ নিয়ে আরো জানা গেছে, হাসপাতালের জন্য একটি বড় জেনারেটর দেওয়া হয়েছে, যা দিয়ে পুরো দ্বীপে বিদ্যুৎ সরবরাহ দেয়া সম্ভব। জেনারেটরটি একদিনের জন্যও চালু করা হয়নি। তালাবদ্ধ অবস্থায় হাসাপাতাল ভবনটিও মরচে ধরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুর আহমদ বলেন, ২০১৭ সালের শেষের দিকে স্বাস্থ্য সচিব সিরাজুল ইসলাম হাসপাতালটি পরিদর্শনে আসলে এখানকার বিভিন্ন সমস্যার কথা তাঁকে তুলে ধরা হয় ফলে তিনি চিকিৎসক নিয়োগের ব্যবস্থা করেন। এরপর ২/৩ মাস ঠিক মতো চিকিৎসা সেবা চালু হয়। কিন্তু ৩ মাস পর আবারো চিকিৎসাসেবা বন্ধ হয়ে যায়। চিকিৎসকরা এখানে থাকতে চায় না। নিয়োগ দিলে টেকনাফ থেকে চলে যায় আর আসেনা সেন্টমার্টিনে। চিকিৎসক না থাকার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানকার পানি ও বিদ্যুৎ সমস্যার অজুহাত দেখিয়ে তারা থাকতে চায় না। বর্তমানে সৌর বিদ্যুৎ চালু হয়েছে। দিনরাত বিদ্যুৎসেবা পাচ্ছি আমরা। বিদ্যুৎ সমস্যা লাঘব হয়েছে। আমরা আবার উধ্বর্তন কর্মকর্তাদের নজরে বিষয়টি দেবো। আশা করি আমরা দ্রুত এ সমস্যার সমাধান পাবো। দ্বীপবাসীর পক্ষ থেকে একমাত্র হাসপাতালে নিয়মিত চিকিৎসক নিয়োগ দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি জোর দাবি জানান ইউপি চেয়ারম্যান।

উপদেষ্টা সম্পাদক : হাসানুর রশীদ
সম্পাদক ও প্রকাশক : মুহাম্মদ শাহজাহান

নির্বাহী সম্পাদক : ছৈয়দ আলম

যোগাযোগ : ইয়াছির ভিলা, ২য় তলা শহিদ সরণী, কক্সবাজার। মোবাইল নং : ০১৮১৯-০৩৬৪৬০

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অধিদপ্তরে নিবন্ধনের জন্য আবেদিত

Email:coxsbazaralo@gmail.com