1. litonsaikat@gmail.com : neelsaikat :
  2. shahjahanauh@gmail.com : কক্সবাজার আলো : কক্সবাজার আলো
  3. syedalamtek@gmail.com : syedalam :

কক্সবাজার পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক অবশেষে বদলি, বহাল তবিয়তে আরো দুই জন

  • আপডেটের সময় : রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০১৫
  • ৯ দেখা হয়েছে

এম.শাহজাহান চৌধুরী শাহীন, কক্সবাজার :
কক্সবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে সীমাহীন দূর্নীতি, অনিয়ম আর জালিয়াতির মহা নায়ক সহকারী পরিচালক (এডি) শরীফুল ইসলামকে অবশেষে ঢাকা জেলায় বদলি করা হয়েছে। গত রবিবার ২০ জুলাই তিনি কক্সবাজারস্থ কর্মস্থল ত্যাগ করেছেন বলে জানা গেছে।
এডি বদলি হলেও জাল-জালিয়াতিতে জড়িত উপ-সহকারী পরিচালক শওকত কামাল ও উচ্চমান সহকারী আবু হানিফ মোস্তফা কামাল এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছে। এখন এরাই পাসপোর্ট অফিসটিকে দূর্ণীতির সুতিকাগারে পরিণত করেছে। ডিএডি শওকত কামাল প্রতিটি পাসপোর্ট ফরম জমা নিতে দেড় হাজার টাকা করে ঘুষ দাবি করায় ২২ জুলাই আবেদনকারী ও পাসপোর্ট অফিস কর্মচারীদের মাঝে লংকা কান্ডের ঘটনা ঘটেছে। বিকাল সাড়ে ৩টার হতে ৫ টা পর্যন্ত ৩৫ জন আবেদনকারী ফরম জমা নেয়া হয় ১ থেকে দেড় হাজার টাকা হারে ঘুষ নিয়ে। তবে তাদের পাসপোর্ট ডেলিভারি স্লিপ দেয়া হয়নি। এমন কি ছবি কিংবা ফিঙ্গার প্রিন্টও নেয়া হয়নি।
সুত্রমতে, কক্সবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে টাকা দিলেই রোহিঙ্গাদের হাতে মিলছে পাসপোর্ট। এখানে কর্মকর্তা কর্মচারীদের অনিয়ম আর দূর্ণীতি কিছুতেই থামছে না। বৈধ পাসপোর্ট আবেদন ফরম জমা নিয়ে প্রকাশ্যে ঘুষ আদায়ের পাশাপাশি অন্তত অর্ধলাখ টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গাদেরও পাসপোর্ট করিয়ে দেয়া হচ্ছে এখানে। ইতোমধ্যে শতশত রোহিঙ্গার হাতে চলেগেছে এমআরপি পাসপোর্ট। ঘোর অভিযোগ উঠেছে ফোর স্টার সিন্ডিকেট করে রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট তৈরি করে দিয়ে কর্মচারীরা দিনদিন নয়া কৌশল ও প্রতারণার নতুন ফাঁদ সৃষ্টি করেছে। কর্মচারীদের এসব প্রতারণা উদঘাটন করেছে স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) কক্সবাজার শাখা। ইতোমধ্যে ৪২টির অধিক রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট আবেদন বাতিল করা হয়েছে। এসব পাসপোর্ট ফরম প্রতি ৬০-৭০ হাজার টাকায় চুক্তি ভিক্তিক জমা নিয়েছিলেন পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তারা। পাসপোর্ট অফিসের অনিয়ম আর দূর্নীতি নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে এধরনের চাঞ্চল্যকর তথ্য। অনিয়ম আর দুর্নীতি করে কর্মকর্তা কর্মচারীরা গাড়ি, বাড়ি, শপিংমল সহ বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছেন অনেকে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কক্সবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসটি ২০০৯ সালে হাতের লেখা পাসপোর্ট প্রদানের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করে। পরবর্তীতে ২০১১ সালের ২২ সেপ্টেম্বর মেশিন রিডেবল (এমআরপি) পাসপোর্ট কার্যক্রম চালু করা হয়। শুরু থেকেই এই পাসপোর্ট অফিস নিয়ে দুর্নাম কম হচ্ছে না। কর্মকর্তাদের নিয়োজিত ও পছন্দের লোকজন সরাসরি যোগাযোগ করেন পাসপোর্ট অফিসের উচ্চমান সহকারী আবু হানিফ মোস্তফা কামাল ও কম্পিউটার অপারেটর রাসেল মাহমুদ চৌধুরীর সাথে। তাদের দু’জনের মাধ্যমেই অফিসিয়াল কাজ কর্ম শেষ করেন। জমা দেওয়া আবেদন ফরমের উপরে সংকেতিক চিহ্ন থাকে। কতিপয় ব্যক্তিদের সাথে বড়কর্তার যোগাযোগ না থাকলেও ভিআইপি ও মওসুম ভিত্তিক কথিত দালালদের সাথে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে আরো জানাযায়, হাতের লেখা জেলার বিভিন্ন এলাকার ভিন্ন ভিন্ন জনের পুরাতন পাসপোর্ট এর কপি কিংবা সংরক্ষিত তথ্য সংশ্লিষ্ট কার্যালয় থেকে সংগ্রহ করেন পাসপোর্ট অফিসের কতিপয় কর্মচারী। এরপর ওই সব হাতের লেখা পাসপোর্ট এর ছায়া কপি চলে যায় ওই সব ব্যক্তিদের হাতে। দালাল চক্র রোহিঙ্গা নারী ও পুরুষ মোয়াক্কেল সংগ্রহ করে। চুক্তিভিত্তিক হাতের লেখা পাসপোর্ট থেকে এমআরপি পাসপোর্ট তৈরির জন্য পুরন করা হয় পাসপোর্ট আবেদন ফরম। এখানে অবলম্বন করা হয় ভিন্ন ভিন্ন কৌশল।
আবেদন ফরমে রোহিঙ্গাদের ছবি সংযুক্ত করে অন্যান্য তথ্যগুলো ঠিক রাখা হচ্ছে। এখানে সংযুক্ত করা হয় ভুঁয়া জন্ম নিবন্ধন সনদ, চেয়ারম্যান সার্টিফিকেট ও থানায় দায়ের করা হয় ভুঁয়া হারানো ডাইরী। কিন্তু এসব কাগজপত্র সম্পূর্ণ ভুঁয়া ভাবে সংযুক্ত করা হচ্ছে। এধরনের পিলে চমকানো চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীদের ‘পুলিশ তদন্ত ’ করতে গিয়ে। থানা .ফাঁড়ি কিংবা এসবি পুলিশ সদস্যরা মাঠ পর্যায়ে এসব আবেদনকারীর পাসপোর্ট ফরম তদন্ত করেন।
অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুস্কুল ইউনিয়নের মেহেদিপাড়া গ্রামের বাহাদুরের স্ত্রী শাকেরা বেগম হাতের লেখা পাসপোর্ট হারিয়ে নতুন এমআরপি পাসপোর্ট করার জন্য গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর ৩ হাজার টাকা ফি ব্যাংক সোনালী ব্যাংকে জমা দিয়ে কক্সবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে আবেদন করেন। একই দিন ১৮ ডিসেম্বর ২০১৪ইং কক্সবাজার থানায় দায়ের করা হারানো ডাইরী (নং-১২৪৬) সহ ওই আবেদনের সাথে সংযুক্ত করেন ২৫/০২/২০১৩ ইংরেজীতে ইস্যুকৃত (জন্ম নিবন্ধন বই নং-০৮), জন্ম নিবন্ধন নং-১৯৬৭২২১২৪৫৯৪৮৮৭৮৩। এছাড়া সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল মাবুদ প্রদত্ত ২০০৯ সালের ৬ মে ইস্যুকৃত (ক্রমিক নং-৯৯০) জাতীয় সনদপত্র। একই ভাবে তানিয়া আকতার নামের এক রোহিংগা নারী দালালের মাধ্যমে ৫০ হাজার টাকায় পাসপোর্ট করতে দেন। ভুঁয়া কাগজপত্র ও ভুঁয়া ঠিকানা দিয়ে পাসপোর্ট আবেদন ফরমও জমা দেয়া হয়। পরবর্তীতে পুলিশ তদন্ত প্রতিবেদনে রোহিঙগা হিসেবে প্রমাণ মেলে। সুচতুর দালাল চক্র এতেও নারাজ। পরে পুন তদন্তের আবেদনও করা হয়। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এসবি অফিসে আবেদনকারী তানিয়া আকতারকে স্ব-শরীরে হাজির হতে বলা হলে তিনি ভয়ে পুনরায় মিয়ানমার চলে গেছেন।
এসব ভুঁয়া কাগজপত্র সংযুক্ত আবেদন ফরম ৬০ হাজার টাকায় জমা নেন পাসপোর্ট অফিসের উচ্চমান সহকারী আবু হানিফ মোস্তফা কামাল। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওইদিন ছবি তোলা ও আঙ্গুলীর ছাপ দিয়ে (এমআরপি নং-১২৪৪১১ শেষে ছয়টি অংক ) ৮ জানুয়ারী ২০১৫ সালে ডেলিভারীর স্লিপও দেয়া হয়। এই আবেদন ফরম নিয়ে কক্সবাজার স্পেশাল ব্রাঞ্চের পুলিশ (এসবি) পিবিআর তদন্ত করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে সংযুক্ত ওই সব কাগপত্রই জাল, ভুঁয়া ও আবেদকারী ভিন্ন ব্যক্তি এবং, বাংলাদেশী নাগরিক নয়। এমনটি কক্সবাজার থানায় দায়েরকৃত এধরনের কোন হারানোর জিডির অস্তিত্বও পায়নি পুলিশ। পরে এই আবেদনটির পিভিআর রিপোর্ট নেগেটিভ দেয় এসবি। এধরনের আরো অন্তত ৪০টির অধিক আবেদনপত্রে এধরনের চাঞ্চল্যকর তথ্য উদঘাটন করেন স্পেশাল ব্রাঞ্চ।
অনুসন্ধানে এধরনের আরো বেশ কিছু আবেদন ফরমের তথ্য পাওয়া গেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে, জেসমিন আকতার (এমআরপি নং-১২২৮৬৯, ৮/১২/২০১৪),মোহাম্মদ আলম (নং-১২৩১৪৯, ৯/১২/২০১৪), শামশুন নাহার (নং-১২৩১৪৬, ৯/১২/২০১৪), আবছার উদ্দিন (নং-১২৩২০৫, ১০/১২/২০১৪), সামশুন নাহার (নং-১২৩৩৬৮, ১০/১২/২০১৪), মামুনুর রশিদ (নং-১২৩৫০৫, ১২/১২/২০১৪), সেলিনা আকতার (নং-১২৩৩৮০, ১১/১২/২০১৪), ফরিদা ইয়াছমিন (নং-১২৩৪৮০, ১১/১২/২০১৪), আবদু শুক্কুর (নং-১২৩৪৫২, ১১/১২/২০১৪), ইসমত আরা বেগম (নং-১২৪১৫১, ১৭/১২/২০১৪), রিয়াজ মোহাম্মদ রাসেল (নং-১২৪০৮৪, ১৭/১২/২০১৪), আবদুল হাকিম (নং-১২৪৪১৩, ১৮/১২/২০১৪), নুর জাহান বেগম (নং-১২৪৪২৫,১৮/১২/২০১৪), তাহমিনা আকতার (নং-১২৪৪১৫, ১২/১২/২০১৪), মোঃ শাহজালাল (নং-১২৪৪৫৮, ১৮/১২/২০১৪), শাকেরা বেগম (নং-১২৪৪১১,১৮/১২/২০১৪),মোঃ জামাল (নং-১২৪৩৭৫, ১৮/১২/২০১৪), নুর নাহার (নং-১২৪৪২১,১৮/১২/২০১৪), রোবেল (নং-১২৪৪১৯, ২১/১২/২০১৪), জান্নাতুল ফেরদৌস (নং-১২৪৫৫৩, ২১/১২/২০১৪), ফেরদৌস বেগম (নং-১২৪৫৫১, ২১/১২/২০১৪), মোঃ রোবেল (নং-১২৪৪১৯, ২১/১২/২০১৪)সহ আরো অর্ধশত পাসপোর্ট আবেদন ফরম বাতিল করে স্পেশাল ব্রাঞ্চ। এইসব আবেদন ফরমের সাথে সংযুক্ত জিডিগুলোও কক্সবাজার সদর মডেল থানায় দায়ের করা হয়েছে বলে দেখানো হয়। পাসপোর্ট আবেদনের সাথে সংযুক্ত কক্সবাজার সদর মডেল থানায় দায়েরকৃত (জিডি) সাধারণ ডাইরীর কপি ও নাম্বারগুলো ভুঁয়া এবং এধরনের কোন জিডির অস্তিত্ব পুলিশ তদন্তে খুঁজে পাননি। এধরনের আরো শত শত পাসপোর্ট রোহিঙ্গা নারী ও পুরুষের হাতে চলে গেছে। এসব ভুঁয়া পাসপোর্ট নিয়ে অনেকে পাড়ি জড়িয়েছে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে।
একটি সুত্র জানিয়েছেন, পাসপোর্ট অফিসে উল্লেখিত ধরনের জালিয়াতি ছাড়াও দিনদিন নিত্য নতুন কৌশল অবলম্বন করেন পাসপোর্ট অফিসের দুর্ণীতিবাজ কর্মকর্তা কর্মচারী ও দালাল চক্র। অনেক সময় পুলিশ তদন্ত রিপোর্টও পক্ষে আনার তদবির করেন দালাল চক্র। এখাতেও গুনতে হচ্ছে মোটা অংকের টাকা। দালালদের একটি সুত্র জানায়, এই অফিসে মাসে অর্ধকোটি টাকারও বেশী অবৈধ লেনদেন হয়। উপ-সহকারী পরিচালক শওকত কামাল শহরে ভাড়া থাকেন বিলাস বহুল বাড়িতে। ভাড়া হিসেবে প্রতিমাসে গুনতে হচ্ছে ২৫ হাজার টাকা। প্রাইভেট কার গাড়ী বাবদ, পরিবার খরচ সহ আনুষাঙ্গিক প্রতিমাসে ব্যয় করছে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা। বিলাসবহুল জীবন যাপনে এসব টাকা জোগান দিতে আশ্রয় নিচ্ছে দূর্নীতি আর প্রতারণা ও জালিয়াতি মুলক কাজে। একই ভাবে উচ্চ মান সহকারী মোস্তফাও কাটাচ্ছে আয়েশি জীবন। তারও রয়েছে টয়েটা গাড়ী। এই দুই কর্তকতার রয়েছে ঢাকা ও চট্টগ্রামে বাড়ি, বিভিন্ন মার্কেটে শপিং মল ও নামে বেনামে সহায় সম্পত্তি।
সুত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের দূর্নীতিবাজ সহকারী পরিচালক শরীফুল ইসলাম কে অবশেষে ঢাকা উত্তরা পাসপোর্ট অফিসে বদলি করা হয়েছে। গত ২০ জুলাই তিনি কক্সবাজারের কর্মস্থল ছেড়েছেন। বর্তমানে উপ-সহকারী পরিচালক শওকত কামাল ও উচ্চমান সহকারী আবু হানিফ মোস্তফা কামাল রয়েছে বহাল তবিয়তে।
কক্সবাজার স্পেশাল ব্রাঞ্চের একটি সুত্র জানিয়েছেন, জেলা পাসপোর্ট অফিস থেকে তদন্তের জন্য পাঠানো ফরমগুলোর তথ্য মাঠ পর্যায়ে তদন্ত করে করা হয়। পিবিআর তথ্যে রোহিঙ্গা প্রমাণ পাওয়ায় রিপোর্ট নেগেটিভ দেয়া হয়েছে।
কক্সবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপ-সহকারী পরিচালক শওকত কামাল ও উচ্চমান সহকারী আবু হানিফ মোস্তফা কামাল এর বক্তব্য নেওয়ার জন্য তাদের ব্যবহৃত মোবাইবলেন ফোনে শত শত বার রিং করার পরেও তারা রিসিভ করেননি।

এই বিভাগের আরও খবর
  • © ২০১৪ - ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | কক্সবাজার আলো .কম
Site Customized By NewsTech.Com