1. litonsaikat@gmail.com : neelsaikat :
  2. shahjahanauh@gmail.com : কক্সবাজার আলো : কক্সবাজার আলো
  3. syedalamtek@gmail.com : syedalam :
শিরোনাম :
নিষেধাজ্ঞামুক্ত হলেন সাকিব আল হাসান একদিনে করোনা আক্রান্ত ৫ লাখ পার, মৃত ৭ হাজার বিশ্বনবী (সা.)-কে কটাক্ষ করে ব্যঙ্গচিত্র প্রদর্শনীর প্রতিবাদে কক্সবাজারে বিক্ষোভ মিছিল চুনতীর ঐতিহাসিক ১৯ দিন ব্যাপী সীরাতুন্নবী (সা:) মাহফিল শুরু টেকনাফ প্রেসক্লাব ভবন নির্মাণ কাজের উদ্বোধন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের বিদায় ঘন্টা বেজে গেছে, পতন আসন্ন- কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতা লুৎফুর রহমান কাজল নিশোর প্রথম চলচ্চিত্রের ট্রেইলার প্রকাশ (ভিডিও) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি নিয়ে সিদ্ধান্ত বৃহস্পতিবার রোনালদোবিহীন বার্সার মুখোমুখি হবে জুভেন্টাস রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারকে তাগিদ যুক্তরাষ্ট্রের

কাশ্মীর, ভারতের তৈরি আর এক ফিলিস্তিন ঃ সংকট যেভাবে শুরু-১

  • আপডেটের সময় : বৃহস্পতিবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬
  • ১১ দেখা হয়েছে

আজিজুল হক বান্না

শত শত বছর জম্মু ও কাশ্মীর ছিল একটি স্বাধীন স্বতন্ত্র স্বাধীন দেশীয় রাজ্য। উপ-মহাদেশ বিভক্তির ভিত্তি হচ্ছে, দ্বি-জাতি তত্ত্ব। ভারতের মুসলিম প্রধান অঞ্চল নিয়ে মুসলিমদের জন্য রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রসমূহ গঠনের সিদ্ধান্ত ত্রি-পক্ষীয়ভাবে মেনে নেয়া হয়। একটি পক্ষ কংগ্রেস, অপর পক্ষ মুসলিম লীগ এবং তৃতীয় পক্ষ বৃটিশ সরকার। এ সময় সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, দেশীয় রাজ্যসমূহ, যা রাজা দ্বারা শাসিত হয়ে আসছিল এবং যেসব রাজ্য ভৌগোলিক ও প্রশাসনিকভাবে বৃটিশ-শাসিত ভারতভুক্ত ছিল না, তা ভারতে বা পাকিস্তানে যোগ দিতে পারবে। অথবা স্বাধীন থাকতে পারবে। এ হিসেবে জম্মু ও কাশ্মীরের রাজনৈতিক ভাগ্য ও রাষ্ট্রীয় চরিত্র নির্ধারণের পূর্ণ এখতিয়ার তাদের জনগণের ওপর ন্যস্ত থাকে।

ভূমিকা-কথন

১৯৪৭ সালে যখন বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা এ উপ-মহাদেশ থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে চলে যায়, তখন তারা ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নেতাদের হাতে ভারতকে প্রধানতঃ দুটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র অর্পণ করে যায়। এর একটি ভারত, অপরটি পাকিস্তান। পাকিস্তানের দুটি অংশের পূর্বাংশ-তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান ১৯৭১ সালে এক রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। এতে ভারতের প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক ভূমিকা ছিল।

শত শত বছর জম্মু ও কাশ্মীর ছিল একটি স্বাধীন স্বতন্ত্র স্বাধীন দেশীয় রাজ্য। উপ-মহাদেশ বিভক্তির ভিত্তি হচ্ছে, দ্বি-জাতি তত্ত্ব। ভারতের মুসলিম প্রধান অঞ্চল নিয়ে মুসলিমদের জন্য রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রসমূহ গঠনের সিদ্ধান্ত ত্রি-পক্ষীয়ভাবে মেনে নেয়া হয়। একটি পক্ষ কংগ্রেস, অপর পক্ষ মুসলিম লীগ এবং তৃতীয় পক্ষ বৃটিশ সরকার। এ সময় সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, দেশীয় রাজ্যসমূহ, যা রাজা দ্বারা শাসিত হয়ে আসছিল এবং যেসব রাজ্য ভৌগোলিক ও প্রশাসনিকভাবে বৃটিশ-শাসিত ভারতভুক্ত ছিল না, তা ভারতে বা পাকিস্তানে যোগ দিতে পারবে। অথবা স্বাধীন থাকতে পারবে। এ হিসেবে জম্মু ও কাশ্মীরের রাজনৈতিক ভাগ্য ও রাষ্ট্রীয় চরিত্র নির্ধারণের পূর্ণ এখতিয়ার তাদের জনগণের ওপর ন্যস্ত থাকে। এককভাবে কাশ্মীর উপত্যকার বা সাধারণভাবে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের জনসংখ্যার অনুপাতে মুসলিমরা বিপুলভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকায় এবং ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, নৃ-তাত্ত্বিক বিচারে কাশ্মীর উপত্যকা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হবার কথা। তবে জম্মু ও কাশ্মীরে যেহেতু বৃটিশ শাসকদের নিযুক্ত একজন বহিরাগত ডোগরা রাজা হরিকিষেণ সিং বহাল ছিলেন, সে কারণে কাশ্মীর যেমন পাকিস্তানভুক্তির প্রাথমিক প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়নি, তেমনি ভারতেরও অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

তবে ইতিহাসের এক নাজুক মুহূর্তে পাক-ভারতের স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পর কাশ্মীরের ভাগ্য নির্ধারণের প্রশ্নটি মুখ্য হয়ে ওঠে। পাকিস্তানের উপজাতীয় পাঠান মুজাহিদরা কাশ্মীর দখল করে নিচ্ছে, এই অজুহাতে আতংকিত মহারাজা হরি সিংকে ভারতের কাছে সাহায্য চাইতে বাধ্য করা হলে ভারত জম্মু ও কাশ্মীরে তার সেনাবাহিনী পাঠিয়ে রাজ্যটি দখল করে নেয়। মুজাহিদদের অগ্রাভিযান ভারতের আবেদনে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় মাঝপথে থেমে যায়। মোট উপত্যকার এক-তৃতীয়াংশ ‘আজাদ কাশ্মীর’ হিসেবে ভারতের দখলমুক্ত হয়। বাকী দুই-তৃতীয়াংশ জম্মু ও কাশ্মীর ভারত বিপুল সেনাবাহিনী দিয়ে আজ অবধি দখল করে রেখেছে।

পাক-ভারত দ্বি-পাক্ষিক আলোচনার সিদ্ধান্ত এবং কাশ্মীরের জনগণের মতামত উপেক্ষা করে একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ স্বাধীনতাকামী মুসলিম জনপদের ওপর ভারত ১৯৪৭-৪৮-এ যে সামরিক দখল প্রতিষ্ঠায় নগ্ন আগ্রাসন চালিয়েছে, তা আজও বহাল আছে। তবে তা কোন স্থায়ী ভিত্তি বা স্থিতিশীলতা পায়নি। জাতিসংঘের দলিলে আজও কাশ্মীর একটি বিরোধপূর্ণ অমীমাংসিত ইস্যু। জাতিসংঘের তদারকীতে কাশ্মীরে একটি গণভোট অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই যুদ্ধবিরতি বলবৎ হয় এবং জাতিসংঘের মধ্যস্থতাকে ভারতই প্রথম স্বাগত জানায়। বরং ভারতই জাতিসংঘের দ্বারস্থ হয়ে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব উত্থাপন করে। কিন্তু ‘শান্তি-শৃঙ্খলার উন্নতি না হওয়া’ এবং অনুকূল অবস্থা তৈরি না হবার অজুহাতে ভারত ছয় দশকেরও বেশী সময় ধরে কাশ্মীরে গণভোট অনুষ্ঠান বাস্তবায়ন করেনি। এর মধ্যে কাশ্মীর নিয়ে পাক-ভারত একাধিক যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। তাতে যুদ্ধবিরতি তথা ‘লাইন অব কন্ট্রোল’ রেখার কোন হের-ফের হয়নি। অর্থাৎ যুদ্ধের মধ্যদিয়ে কাশ্মীর সমস্যার সমাধান হয়নি। আঞ্চলিক উত্তেজনা বরং বেড়েছে। তবে ভারত ‘Instrurment of Accession’-এর অজুহাতে কাশ্মীরকে তার সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় ভূ-খন্ডের অবিচ্ছেদ্য একটি রাজ্য হিসেবে ক্রমশঃ অন্তর্ভুক্তকরণের এক নোংরা সামরিক-রাজনৈতিক আধিপত্যবাদী জুয়াখেলা চালিয়ে আসছে। Instrurment of Accession সত্ত্বেও ভারত জম্মু-কাশ্মীরের Special Status স্বীকার করে তাদের সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদের দ্বারা কাশ্মীরের স্বাধীন সত্তা সংরক্ষণের অংগীকার করে। যা অন্য কোন দেশীয় রাজ্যের ক্ষেত্রে তারা করেনি। এমনকি হায়দ্রাবাদ, জুনাগড়, মানভাদর, গোয়া, দমন, দিউ সহ আরও অনেক দেশীয় রাজ্যকে জোর করে দখল করে নিলেও তাদের ভারত কাশ্মীরের মতো সাংবিধানিক বিশেষ মর্যাদার স্বীকৃতি দেয়নি। এমনকি, সর্বশেষ স্বাধীন রাষ্ট্র-ভূটানকে গ্রাস করে ভারতের একটি অঙ্গ রাজ্যের অবস্থানে অবনয়ন করা সত্ত্বেও ভূটানকে এ ধরনের কোন সাংবিধানিক স্টেটাস দেওয়া হয়নি। কিন্তু ভারত তাদের সংবিধানের ৩৭০-অনুচ্ছেদকেও অকার্যকর করে কাশ্মীরের বিশেষ সংরক্ষণ ও মর্যাদা কেড়ে নিয়েছে। অর্থাৎ কাশ্মীরকে গ্রাস করলেও ভারত তাকে তার সাংবিধানিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার পুরোপুরি অবিচ্ছেদ্য অংশ বানিয়ে নিতে পারেনি। অথবা কাশ্মীরের জনগণ, রাজা কিংবা শেখ আবদুল্লাহ কেউই এটা মেনে নেননি। তবু ভারত বলছে, কাশ্মীর তাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং কাশ্মীর ইস্যুতে তারা তৃতীয় পক্ষ বা আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর নাক গলানো মেনে নেবে না। এমনকি তাদের মতে, কাশ্মীর নিয়ে অন্যের কথা বলার এখতিয়ার তারা মানতে চায় না।

পাকিস্তানের ও ইতিহাসের গতিধারা

ইতিহাস কখনও কোন একক জাতি বা পরাশক্তির খেয়ালীপনার বা নিষ্ঠুরতার অনুবর্তী নয়। ইতিহাস আবর্তিত হয় তার আপন গতিপথে। ইতিহাসের নিয়ন্ত্রক প্রকৃতি। আর প্রকৃতির নিয়ন্তা হচ্ছেন অদৃশ্যমান মহাশক্তিমান আল্লাহ রাববুল আলামীন। অবশ্যই ইতিহাসের উপাদান মানুষ ও তার পরিপার্শ্ব। অতি সম্প্রতি কাশ্মীর উপত্যকা জুড়ে ইতিহাসের অগ্নিগর্ভ দোলাচল আবার দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। পাঁচ লাখ নিয়মিত সেনাবাহিনী এবং আরও কয়েক লাখ নিরাপত্তা রক্ষী নিয়োগ করেও দিল্লী উপত্যকার আগুন নেভাতে পারছে না। ভারতের সেনা প্রধান জেনারেল ভি.কে. সিং বলেছেন, কাশ্মীরে সেনাবাহিনীর এখন কিছু করণীয় নেই। তাঁর মতে, কাশ্মীর সমস্যা রাজনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবেই তার মীমাংসা করতে হবে।

কাশ্মীরে সম্প্রতি ভারতীয় দখলদার বাহিনীর নির্বিচার গুলিতে এক কিশোরের নির্মম মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে উপত্যকা জুড়ে। এতে এ পর্যন্ত ১১১ জন অসামরিক শান্তিপ্রিয় কাশ্মীরি শাহাদাৎ বরণ করেন। গণ-বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ ঠেকাতে ভারত সরকার ও তার বশংবদ রাজ্য সরকার উপর্যুপরি উপত্যকা জুড়ে কার্ফু্য জারী করে জনতার বিক্ষোভ ঠেকাতে পারেনি। বন্দুক-বেয়োনেটের নির্বিচার ব্যবহার ও দেখামাত্র গুলির নির্দেশকে উপেক্ষা করে কাশ্মীরের তরুণ-কিশোর, যুবক-নারীরা প্রতিবাদে-বিক্ষোভে নতুন ইতিহাস তৈরি করেছেন। তারা ভারতীয় সেনা প্রত্যাহার, গণহত্যা বন্ধ এবং ভারতীয় সেনার দখলদারিত্ব তুলে দিয়ে কাশ্মীরের অপহৃত ‘আজাদী’ ফিরিয়ে দেবার উচ্চকিত স্লোগানে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে তোলেন। এবারই প্রথম কাশ্মীর উপত্যকার স্বাধীনতা সংগ্রামী সংগঠনগুলোর পরিচিত নেতাদের সাংগঠনিক তৎপরতা ও রাজনৈতিক নির্দেশনা ছাড়াই জম্মু-কাশ্মীরের নতুন জেনারেশন ভারতীয় দখলদার সেনা ও দিল্লীর বশংবদ সরকারের বিরুদ্ধে আজাদীর লড়াইয়ে মুখোমুখি হয়েছেন। এবারই প্রথম পাকিস্তান বা ভারত কথিত ‘ক্রস বর্ডার’ ইসলামী মুজাহিদ-জঙ্গিদের কোন ভূমিকা ছাড়াই উপত্যকার সাধারণ মানুষ স্ব-প্রণোদিত হয়ে আজাদীর দাবীতে রাজপথে নেমে এসেছেন। এটা কাশ্মীরের চলমান আজাদী সংগ্রামকে নতুন ডাইমেনশন দিয়েছে।

কাশ্মীর উপত্যকার সবচেয়ে প্রধান ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় ৮১ বছর বয়স্ক স্বাধীনতা সংগ্রামী হুররিয়াত নেতা সাইয়েদ আলী শাহ গিলানীকে গৃহবন্দী করে রাখা সত্ত্বেও কাশ্মীর উপত্যকা জুড়ে অতীতের চেয়ে বেগবান ও দুর্বার আজাদী আন্দোলনের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। অপর শীর্ষ স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতা মাসারাত আলমকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। আজাদী আন্দোলনের একমাত্র মহিলা নেত্রী আয়েশা আন্দ্রাবীকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। দীর্ঘ অর্ধ শতাব্দীকাল ধরে নির্যাতন-নিপীড়ন-ধর্ষণ-লুণ্ঠন-গুম-অপহরণ এবং প্রত্যক্ষ সামরিক আগ্রাসন সত্ত্বেও ভারত কাশ্মীরের নবীন প্রজন্মকে আজাদীর স্বপ্ন ও চেতনা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। তবে ভারত সামরিক পথ ছেড়ে এই প্রথম কাশ্মীরে একটি সর্বদলীয় রাজনৈতিক প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছে, সকল স্তরের মানুষের মতামত নিয়ে দিল্লী সরকারের নির্দেশে একটি রাজনৈতিক সমাধান সুত্র খুঁজে বের করতে। এটাও সমাধানের পথ নয়। কাশ্মীরে গিয়ে এই প্রতিনিধি দলটি জনগণের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হন। তারা জনমতের উত্তেজনা প্রশমন করার পথ খুঁজেছেন ভারতীয় সংবিধানের আওতায়। বিশেষ করে, ভারত সরকার সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কাশ্মীরের জনগণকে যে ‘‘Special status” দিয়েছেন, এই প্রতিনিধি দল তা পুনর্বহালের প্রশ্ন পর্যন্ত স্পর্শ করেননি। এমনকি দফায় দফায় ভারত সরকার তার বশংবদ ও পুতুল রাজ্য সরকারের মাধ্যমে ৩৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনে সম্মতি আদায় করে ‘বিশেষ মর্যাদার’ বিকৃতি ঘটিয়ে কাশ্মীরকে যেভাবে কাগজে-পত্রে প্রায় ভারতীয় রাজ্য বানানোর প্রক্রিয়া শেষ করে এনেছে, তা প্রত্যাহারের বিষয় নিয়েও সর্বদলীয় রাজনৈতিক টিম মাথা ঘামায়নি। অর্থাৎ দিল্লী সরকারের প্রেরিত প্রতিনিধি দলের মিশন বিরাজমান ভারতীয় রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক স্থিতাবস্থা রক্ষা করে জনগণের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন বন্ধ, মানবাধিকার পুনর্বহাল, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক সংস্কার, তথা বেকারত্ব নিরসনের বিষয়েই দৃষ্টি নিবব্ধ রাখেন। এতে সমস্যার মৌলিক কোন পরিবর্তন ঘটবে না।

তবে সর্বদলীয় প্রতিনিধি দল কাশ্মীরে গিয়ে ‘সবার সাথে’ মতবিনিময় করে দিল্লী সরকারের কাছে সংকট নিরসনের যে সুপারিশ তারা করেছেন, তার মধ্যদিয়ে কয়েকটি বিষয় স্বীকৃতি পেয়েছে। প্রথমতঃ ভারত আভ্যন্তরীণ ও জাতীয়ভাবে এই প্রথম স্বীকার করলো যে, কাশ্মীরে সংকট বিরাজমান এবং সেখানে তারা শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে। দ্বিতীয়তঃ জম্মু-কাশ্মীরের জনগণ ভারতের গোলামী মেনে নেয়নি এবং মেনে নিতে প্রস্ত্তত নয়। তৃতীয়তঃ কাশ্মীর সমস্যার সামরিক সমাধান সম্ভব নয় এবং তারা শঠতা ও ভীতি সঞ্চার করে যে Instrument of Accession অস্ত্র ব্যবহার করে কাশ্মীর দখল-পর্ব সমাধা করেছে বলে বিশ্ববাসীকে ধোঁকা দিয়ে আসছিল, তার কোন ভিত্তি নেই। চতুর্থতঃ কাশ্মীর উপত্যকায় যে আজাদীর আওয়াজ উচ্চকিত হয়ে আসছে, তার পেছনে প্রতিবেশী পাকিস্তানের উস্কানীকে দায়ী করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘ক্রসবর্ডার টেরোরিজমের’ যে অভিযোগ উত্থাপন করে ভারত পাকিস্তানকে ‘জঙ্গিরাষ্ট্র’ হিসেবে একঘরে করতে চেয়েছে, সেই প্রচারণাটিও অসত্য বলে প্রমাণ হলো।

উল্লেখ্য, বেনজির ভুট্টো সরকার, জেনেভার মানবাধিকার সম্মেলনে কাশ্মীরে ভারতের মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগ তুলেও তা প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছিল ভারতের কূটচালে। ভারত আজ পর্যন্ত জম্মু-কাশ্মীরে কূটনৈতিক প্রতিনিধি দল, আন্তর্জাতিক কিংবা স্থানীয় মানবাধিকার গ্রুপকে প্রবেশ করতে দেয়নি। যদিও বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদেশীদের অবাধ যাতায়াতকে বাংলাদেশ অনুমতি দিয়েছে।

কাশ্মীরের গণহত্যা, নির্যাতন-নিপীড়ন, কথায় কথায় স্বাধীনতাকামী কাশ্মীরিদের ‘পাকিস্তান চর’ বা সন্ত্রাসী বানানোর এক বীভৎস অবদমন নীতি চালাচ্ছে দিল্লী সরকার। এ পর্যন্ত ভারতীয় দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে আজাদী আন্দোলনে কাশ্মীরের ৭০ হাজার থেকে প্রায় ১ লাখ মানুষ জীবন দিয়েছেন বলে কাশ্মীরি সূত্রগুলো উল্লেখ করেছে। আর কত রক্ত দিতে হবে, কাশ্মীরিরা তা জানেন না। সাম্প্রতিক সময়েও ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে ১১১ জন তরতাজা মানুষ জীবন দিয়েও তারা নিবৃত্ত হননি। বরং আজাদীর আওয়াজ আরও দীপ্ত ও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে। কার্ফু্য প্রত্যাহার, স্কুল-কলেজ খুলে দেওয়া এবং কাশ্মীরে সর্বদলীয় ভারতীয় প্রতিনিধি দলের সফরের পরও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। সেখানে এরপরও দফায় দফায় কার্ফু্য দেওয়া হচ্ছে। স্বাধীনতাকামীদের বিক্ষোভ-জমায়েত ঠেকাতে দফায় দফায় কার্ফু্য দেওয়া একটা পুরনো রীতি। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে যে আজাদীর চেতনা জাগ্রত রয়েছে, তা নিবৃত্ত করার কোন অস্ত্র ভারতের হাতে নেই।

নয়া বিশ্বযুদ্ধের নাভি-কেন্দ্র

কাশ্মীর শুধু পাক-ভারত সমস্যা ও উত্তেজনার মূল কেন্দ্রই নয়। কাশ্মীর হচ্ছে, ভবিষ্যৎ বিশ্বযুদ্ধের একটি জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি, বিশ্বযুদ্ধের নাভি-কেন্দ্র। উপ-মহাদেশের শান্তি ও স্থিতি এবং নিরাপত্তার প্রেক্ষিতে বিচার করলে কাশ্মীর কেবল পাক-ভারত সমস্যারই কেন্দ্রবিন্দু নয়। পাকিস্তান ও ভারত দুটি পরমাণু অস্ত্রসজ্জিত দেশ হবার কারণে দু’দেশের মধ্যে আর এক দফা যুদ্ধ বেঁধে গেলে তা পরমাণু যুদ্ধের ধ্বংসাত্মক পরিণতির দিকে ধাবিত হতে পারে। এ কারণে কাশ্মীর নিয়ে বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের অন্য সকল দেশেরও উদ্বিগ্ন হবার প্রশ্ন রয়েছে। বিগত কারগিল যুদ্ধের সময় পাক-ভারত পরমাণু যুদ্ধের কাছাকাছি উপনীত হয়েছিল।

ইরাক-আফগান যুদ্ধের পরাজয় মাথায় নিয়ে ইঙ্গ-মার্কিন-ন্যাটো সামরিক জোট- তাদের অবস্থান বদল করে এশিয়ায় তাদের সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি ও মনযোগ সংহত করতে শুরু করেছে। আফগানিস্তানে মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনী প্রায় পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হয়েও ভূ-রাজনৈতিক স্ট্রাটেজিক কারণে আফগান্তিান ছাড়তে পারছে না। রাশিয়া, মধ্য এশিয়া, ইরানকে চাপে রাখার সুযোগ হাতছাড়া করার লোভ সংবরণ করতে না পারা, পাকিস্তানের স্ট্রাটেজিক ও পরমাণু শক্তি স্থাপনার ওপর নজরদারি করা এবং ভারতের চীনা ভীতিকে কাজে লাগিয়ে আমেরিকার চীন বিরোধী সামরিক অক্ষ তৈরির সমরনৈতিক রাজনীতি ক্রমশঃ জোরদার করা হচ্ছে। চীনের সমরশক্তি বৃদ্ধি ও ভারতকে ঘিরে ধরার কৌশল ভারতকে উদ্বিগ্ন করেছে। এই সুযোগে মার্কিন-ইসরাইল পাশ্চাত্য অক্ষ ভারতের কাছে বিপুল অস্ত্র বিক্রির সুযোগ হাতিয়ে নিচ্ছে। চীনারা লাদাখ ও আকসাই চীনে সেনা মোতায়েন করায় এবং ঐ এলাকায় সামরিক নজরদারি বৃদ্ধি করায় ভারতের উদ্বেগ বৃদ্ধি পেয়েছে। আজাদ-কাশ্মীর রুটে চীন চাইলে পাকিস্তানে সড়কপথে সামরিক সহায়তা দিতে পারে। পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের গদর-এ চীনা সহায়তায় পাকিস্তানের সমুদ্র বন্দর তৈরি ভারতের উদ্বেগের মাত্রা বৃদ্ধি করেছে। পাকিস্তানকে মানচিত্র থেকে নিশ্চিহ্ন করা কিংবা সীমান্ত বিলোপ করে ‘৪৭-পূর্বাবস্থায় ফিরে গিয়ে কংগ্রেস-হিন্দু মহাসভার অখন্ড’ ভারত তৈরির স্বপ্ন বিলাস সংকুচিত হয়ে আসছে। দিল্লী শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের সাথেও বৈরীতা হ্রাস করে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চায়। এতে তার আন্তরিকতার অভাব থাকা সত্ত্বেও এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালানোসহ অন্তর্ঘাত পর্যায়ে বৈরীতা অব্যাহত রাখছে ভারত। কাশ্মীরসহ হিমালয়ান অঞ্চলকে কেন্দ্র করে যে নয়া সামরিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, ভারত তাকে উপেক্ষা করতে পারছে না বলেই কাশ্মীর পলিসিকে অসামরিককরণ করে কাশ্মীরের জনগণের মন জয় করার উদ্যোগ নিতে বাধ্য হচ্ছে। মানুষের মন জয় ছাড়া যে ‘রাজ্য’ জয় স্থায়ী হয় না, ইতিহাসের এ সত্যকে ভারত বুঝতে শুরু করেছে কিনা, তারপরও এ প্রশ্ন থেকেই যায়।

কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে ভারতের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নতুন মেরুকরণ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে। এর কোনটাই দিল্লীর নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের সুখকর শুভ নয়। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং সহ বাঘা বাঘা নিরাপত্তা বিশ্লেষকও মাওবাদীদের উত্থানকে আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড়ো সংকট বলে চিহ্নিত করেছেন। মাওবাদীদের সাথে আলোচনা-সংলাপ যেমন সফল হয়নি, তেমনি তাদের বিরুদ্ধে ঢালাও সামরিক বা আধা সামরিক অভিযান চালিয়েও বিশেষ সুবিধা করা যাচ্ছে না। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি-চিদাম্বরম ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মাওবাদীদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর সিদ্ধান্তের প্রান্তসীমায় পৌঁছেও পিছু হটে এসেছেন।

মাওবাদীরা সম্প্রতি কাশ্মীরের লড়াকু মানুষের আজাদী সংগ্রাম তথা তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের দাবীর প্রতি সংহতি ঘোষণা করায় একটা নতুন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের স্বাধীনতাকামী সংগঠনগুলোও একই পথ অনুসরণ করলে তাতে আশ্চর্য হবার কিছু থাকবে না। মাওবাদীরা তাদের নিয়ন্ত্রিত ৬টি রাজ্যে কাশ্মীরের জনগণের স্বাধীনতার পক্ষে সাধারণ ধর্মঘটের কর্মসূচী পর্যন্ত ঘোষণা করেছে। [Maoists Intensify Activites : call strikes in six Ctates supporting Kashmir, Shamsuddin Ahmed, Holiday, 10 September, 2010]

Instrurment of Accession :

পন্ডিত নেহেরুর চাণক্য নীতি

১৮৬৯ সালে লর্ড মেয়ো ভাইসরয় হয়ে ভারতে আসেন। শিখদের সাথে সম্পাদিত ‘অমৃতসর সন্ধি’-তে জম্মু-কাশ্মীরের ওপর বৃটিশ শাসকদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা ছাড়াই ডোগরা রাজাদের হাতে জম্মু-কাশ্মীর ছেড়ে দেওয়ার কঠোর সমালোচনা করেন তিনি। প্রথমতঃ বৃটিশরা ভারতে তাদের সাম্রাজ্যের নিরাপত্তার জন্য কোন শক্তিশালী দেশীয় রাজার অস্তিত্ব চায়নি। দ্বিতীয়তঃ কাশ্মীর উপত্যকায় পুরনো পথে বহিরাগতরা এসে যেন তাদের সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা হানি ঘটাতে না পারে, সে বিবেচনায়ও জম্মু-কাশ্মীর উপত্যকায় কার্যকর কূটনৈতিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা তারা অনুভব করেছে। ১৮৭১ খৃস্টাব্দে বৃটিশ সরকার কাশ্মীরের ডোগ্রা রাজাকে কাশ্মীরের বৃটিশ প্রতিনিধির মর্যাদাকে ভারত সরকারের প্রত্যক্ষ প্রতিনিধির মর্যাদা স্বীকার করিয়ে নিতে বাধ্য করেন। এর আগে কাশ্মীরের বৃটিশ প্রতিনিধি পাঞ্জাবের শিখ রাজার প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন।

বৃটিশ সমরবিদ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করতেন, রাশিয়া উত্তর দিক থেকে, উত্তর-পূর্ব সীমান্ত হয়ে বারোগহিল ও ইশ্ককোমান পার হয়ে ভারতের মূল ভূ-খন্ডে হামলা চালাতে পারে। এ কারণে তারা হুনযা, নাগর, চিলাস, পুনিয়াল, ইয়াসিন ও গিলগিট অঞ্চলকে বিপজ্জনক মনে করতো। বৃটিশরা মহারাজার আন্তর্জাতিক সীমানা নিয়ন্ত্রণ ও কোন বৈদেশিক শক্তির সাথে সন্ধি সম্পন্ন রক্ষার ব্যাপারে সতর্ক ছিল। তারা ভারতে নিজেদেরকেই কেবল সার্বভৌম রাষ্ট্রশক্তি মনে করতো। দেশীয় রাজাদের কার্যক্রম স্থানীয় পর্যায়ে সীমিত রাখাই ছিল তাদের রাষ্ট্রীয় পলিসি। এরপর থেকে বৃটিশরা রাশিয়ার সাথে আন্তর্জাতিক সীমানা চিহ্নিতকরণের পদক্ষেপ নেয়। মহারাজা রাশিয়ানদের কাছে নিজেকে স্বাধীন নৃ-পতি হিসেবে প্রমাণ করতে চাইতেন এবং বৃটিশের প্রতি তার আনুগত্যকে ‘‘প্রতীকী’’ বলে বিশ্বাস করাতে চেয়েছেন। এ বিষয়টিও বৃটিশদের শংকিত করে তোলে।

কাশ্মীরে বৃটিশ অনুগ্রহপুষ্ট ডোগ্রা মহারাজাকে শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর তারা সাম্রাজ্যের একটা

আন্তর্জাতিক সীমানা নির্ধারণের উদ্যোগ নেন। এর মাধ্যমে তারা বিদেশী শক্তির কাছে সাম্রাজ্যের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা ও নিজেদের সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা নিয়ে নিশ্চিত হতে চেয়েছে।

১৯৩০ সালের ভারত শাসন আইনে প্রথম শাসনকার্যে ভারতীয়দের সীমিত অংশীদারিত্ব স্বীকৃতি পায়। কাশ্মীর উপত্যকায়ও এর ঢেউ আছড়ে পড়ে। ভারতের অন্যান্য স্থানে সরাসরি বৃটিশ শাসন বহাল থাকায় স্থানীয়দের শাসনকার্যে অংশীদারিত্ব সরাসরি স্বীকৃতি পায়। কিন্তু যেহেতু কাশ্মীর উপত্যকায় বৃটিশরা অবৈধভাবে একজন অত্যাচারী ও গণবিরোধী স্বঘোষিত রাজা চাপিয়ে দিয়েছে, তার ফলে ভারত-শাসন আইনের সুফল পাওয়া কাশ্মীর উপত্যকার মানুষের জন্য কঠিন ছিল।

কাশ্মীর দীর্ঘকাল ধরে বহিরাগতদের দ্বারা শাসিত, শোষিত ও নির্যাতিত হয়েছে। সরকারী চাকুরী ও প্রশাসনে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ভূমিপুত্রদের কোন অধিকার ও হিস্যা ছিল না। ফলে ‘কাশ্মীর কাশ্মীরিদের জন্য’’ উপত্যকায় ক্রমশঃ এই স্লোগানের ভিত্তিতে আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে। এক পর্যায়ে রাজ্য সরকারের উচ্চপদ ও প্রশাসনে কাশ্মীরিদের নিয়োগের দাবী কিছুটা মেনে নেয়া হয় বটে।

কিন্তু ডোগ্রা রাজা তা কার্যকর করেনি। তার রাজ্য প্রশাসনে, রাজস্ব বিভাগ ও সেনাবাহিনীতে কাশ্মীরি পন্ডিত ও ডোগ্রা রাজপুত্র-শিখদের নিয়োগকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। কাশ্মীরি হিসেবে সরকারী সুযোগের প্রায় সবটুকুই সংখ্যালঘু স্থানীয় অভিজাত কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ পন্ডিতরা দখল করে নিত। সেনা বাহিনীর উচ্চপদগুলো ছিল ডোগ্রা-রাজপুত্রদের জন্য সংরক্ষিত। কাশ্মীরি ভূমি পুত্রদের দীর্ঘকাল অসামরিককরণ করে রাখার ফলে তাদের পক্ষে অবৈধ ও বহিরাগত শাসকদের বিরুদ্ধে সামরিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার সুযোগ ছিল সীমিত। ১৯৪৭-পরবর্তীকালে ভারত সামরিক শক্তিতে জম্মু-কাশ্মীর দখল করে নিলে সেখানে লাখ লাখ ভারতীয় সেনা সদস্যদের পদচারণা দেখা গেলেও রাজ্য নিরাপত্তা বাহিনী কিংবা ভারতের কেন্দ্রীয় সেনাবাহিনীতে কাশ্মীরীদের প্রবেশাধিকার সীমিত করে রাখা হয়। একটি জাতিকে নিরস্ত্র ও অসামরিক করে রেখে গোলামীর শৃঙ্খল পরিয়ে রাখাই এর উদ্দেশ্য।

কাশ্মীর উপত্যকায় ডোগ্রা রাজার অত্যাচার নিপীড়নের বিরুদ্ধে লাহোরের মুসলিম মিডিয়া ব্যাপকভাবে প্রচার চালায়। ১৯২৯ খৃস্টাব্দে লাহোর থেকে আইন ডিগ্রী অর্জনকারী প্রথম কাশ্মীরী নেতা গোলাম আববাস সাংগঠনিকভাবে মহারাজার অপশাসনের বিরুদ্ধে ‘আন্জুমানে ইসলামিয়া’ সংগঠনের ব্যানারে মুসলিম যুবকদের সংগঠিত করেন। আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাস করা মুসলিম গ্রাজুয়েট যুবকরাও এতে যুক্ত হন। এঁদের মধ্যে ছিলেন প্রেমনাথ বাজাজ, গোলাম আববাস, মুহাম্মদ ইউসুফ শাহ প্রমুখ। ১৯৩১ সালে ইউসুফ শাহ তার চাচাকে শ্রীনগরের মীর ওয়াইজ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।

মহারাজা হরি সিং আবদুল কাদির নামের এক প্রতিবাদী মুসলিম যুবককে গ্রেফতার করলে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষুব্ধ মুসলিমরা কারাগারমুখী মিছিল নিয়ে এগুতে চাইলে হরি সিং বাহিনী নির্বিচার গুলি চালায়। এতে ২১ জন মুসলিম শহীদ হন। উত্তেজিত জনতা লাশ নিয়ে মিছিল করে শহরের কেন্দ্রস্থলে সমবেত হন। হিন্দুরা ডোগ্রা মহারাজার পক্ষ নেয়।

শেখ আবদুল্লাহ : ইতিহাসের নায়ক থেকে খলনায়ক

ভারতের আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইন্সে মাস্টার্স ডিগ্রী নিয়ে শেখ আবদুল্লাহ কিছুদিন শিক্ষকতা করেন। মুসলিম হবার কারণে মহারাজা সরকারে তিনি কোন উচ্চপদে চাকুরী পাননি। বিদেশে উচ্চশিক্ষার আশাও তাঁর পূর্ণ হয়নি। ১৯৩০-এর দিকে শেখ আবদুল্লাহর রাজনীতিতে আগমন। শেখ আবদুল্লাহর কোন এক পূর্বপুরুষ হিন্দুব্রাহ্মণ পন্ডিত প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শেখ মোহাম্মদ ইব্রাহীম কাশ্মীরের শাল ব্যবসায়ী। শেখ আবদুল্লাহ ভালো বক্তা ছিলেন এবং মানুষকে উত্তেজিত করার ক্ষমতা তাঁর ছিল। কিন্তু অচিরেই মহারাজার কুনজরে পড়ে তিনি গ্রেফতার হন। ১০ মাস অন্তরীণ থাকার পর মুক্তি পেয়ে তিনি অন্যদের সাথে নিয়ে রাজনৈতিক সংগঠন All India Kashmir Committee গঠন করেন। ১৯৩১ সালের ১৩ জুলাই এর উদ্বোধনী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় সিমলায়।

এরপর শেখ আবদুল্লাহ তাঁর অপর বন্ধুদের নিয়ে ‘মুসলিম কনফারেন্স’ দল গঠন করেন। তিনি এর প্রথম প্রেসিডেন্ট এবং গোলাম আববাস সেক্রেটারী নির্বাচিত হন। শেখ আবদুল্লাহর ওপর আহমদিয়া কাদিয়ানীদের যেমন প্রভাব ছিল, তেমনি প্রভাব ছিল কাশ্মীরী পন্ডিতদেরও। আর কংগ্রেস নেতা পন্ডিত নেহেরু তো তাঁকে বন্ধুত্বের টোপ ফেলে দিকভ্রান্তই করে ফেলেন। ফলে শেখ আবদুল্লাহ মুসলিম লীগের দ্বি-জাতি তত্ত্বের রাজনীতির বদলে কংগ্রেসের সেক্যুলার রাজনীতিকেই তাঁর আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেন। দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ বাদ দিয়ে তিনি ‘ন্যাশনাল’ যুক্ত করে ন্যাশনাল কনফারেন্স নামে কাশ্মীরে কংগ্রেসের যমজ একটি রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারে রাজনীতিতে আবির্ভূত হন।

পাকিস্তান-উত্তরকালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে একইভাবে কংগ্রেসের প্রভাবে শেখ মুজিব আওয়ামী মুসলিম লীগের ‘মুসলিম’ বাদ দিয়ে সেক্যুলারিজমের আদর্শ নিয়ে আওয়ামী লীগ নামে রাজনীতি সূচনা করেন। এ কাজটি প্রথম শুরু করেন শেখ আবদুল্লাহ। এর ফলে মনোরঞ্জন ধর, ফনী মজুমদাররা কংগ্রেসের সানইবোর্ড গুটিয়ে আওয়ামী লীগের কান্ডারী হয়ে যান।

কাশ্মীর ও ন্যাশনাল কনফারেন্স মুসলিম জাতীয়তাবাদের বদলে সেক্যুলারিজম গ্রহণ করায় কাশ্মীরী পন্ডিত ও কংগ্রেসী ‘সেক্যুলাররা’ ন্যাশনাল কনফারেন্সে যোগ দেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ডিপি ধর, আই-কে-গুজরাল প্রমুখ। ডিপি ধর ১৯৭১-এ তার কমিউনিস্ট ব্যাকগ্রাউন্ডকে কাজে লাগিয়ে সোভিয়েত রাশিয়ার সাথে ভারতের ২০ সালা মৈত্রী চুক্তি সম্পাদনে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছেন এবং বাংলাদেশ-উত্তরকালে মুজিব সরকারের ওপর দিল্লী সরকারের পক্ষে ‘মগজ ধোলাই’ উপদেষ্টার ভূমিকা পালন করেছেন। আই-কে-গুজরাল প্রথমে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ‘গুজরাল ডকট্টিন’-এর উদ্ভাবক হিসেবে খ্যাত হয়েছেন।

বাংলাদেশ ও কাশ্মীর উপত্যকার দুই ‘শেখ’-কে কংগ্রেসী নেতারা সেক্যুলারিজমের টোপে বশীভূত করে ইতিহাসের গতি ঘুরিয়ে দিয়েছেন এবং দুই অঞ্চলের সাধারণ মুসলিমদের রাজনৈতিক বিপর্যয়কে অনিবার্য করেছেন। এ দুটি ঘটনা উপ-মহাদেশীয় রাজনীতিতে মুসলিমদের জন্য দুঃখজনক মাইলস্টোন। শেখ আবদুল্লাহ পন্ডিত নেহেরুর সেক্যুলারিজমের বন্ধুত্বের নামে প্রতারিত হয়েছেন এবং প্রধানতঃ তাঁর ভুলের জন্যই কাশ্মীরের মুসলিমরা ভারতের গোলামীর শৃঙ্খলে বন্দী হতে বাধ্য হয়েছেন।

এদিকে বাংলাদেশের বৃহত্তর মুসলিম জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক মাইন্ড সেট বদলে দিয়ে তাদেরকে সেক্যুলারিজমের কামলা বানানোর নয়া প্রক্রিয়ায় বাঙালী মুসলিমদের রাষ্ট্রীয় অর্জন বিপন্ন হবার অবস্থা তৈরি হয়েছে। কংগ্রেসের সেক্যুলারিজম ইউরোপের সেক্যুলারিজমের কার্বন কপি নয়। যদিও ভারতীয় কংগ্রেসের দুই দিকপাল ‘মহাত্মা’ গান্ধী ও পন্ডিত নেহেরু উভয়ই ইউরোপ উচ্চশিক্ষাপ্রাপ্ত। কিন্তু কংগ্রেসের সেক্যুলারিজম হচ্ছে বর্ণচোরা ‘হিন্দুত্বের’ শোভন সংস্করণ। এতে মুসলিমের মুসলমানিত্ব বিসর্জন দিতে হবে এবং ‘ভারতীয়’ জাতীয়তার নামে তাঁদের হিন্দুত্বের পূজারী হতে হবে। জম্মু ও কাশ্মীর ভারতভুক্ত না হয়ে একটি স্বাধীন-স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে তখনই অস্তিত্ব লাভ করে টিকে থাকতে পারবে, যখন মুসলিম জাতীয়তা ও স্বাতন্ত্রকে তার রাজনৈতিক আইডেন্টিটি হিসেবে বুলন্দ করা সম্ভব হবে। কাশ্মীরের বৃহত্তর জনগণ ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচরণগতভাবে মুসলিম বলেই শেখ আবদুল্লাহর মতো রাজনৈতিক নেতাদের উদ্ভব ঘটেছে এবং জনগণ তাঁকে ‘শের-এ-কাশ্মীর’ হিসেবে তাকে তারা বরণ করে নিয়েছেন। দ্বিতীয়তঃ কাশ্মীর উপত্যকা কেবল ভৌগোলিক কারণেই নয়, স্বতন্ত্র ও ভারতের নিয়ন্ত্রণের বাইরে এজন্যই থাকবে, যেহেতু কাশ্মীর একটি মুসলিম প্রধান জনপদ। শেখ আবদুল্লাহ কংগ্রেসের সেক্যুলারিজমের ধাঁন্ধায় সেক্যুলার রাজনীতি চর্চা করতে গিয়ে নেতৃত্ব ও দেশ দুটোই হারিয়েছেন। কংগ্রেস সেক্যুলার রাজনীতি করলেও গান্ধী নিজে ছিলেন প্রাচীন বৈদিক হিন্দুত্বের পুনরুজ্জীবনবাদী ‘মহাত্মা’। তাঁর রাজনীতির পাশাপাশি তাঁর ধর্মীয় আরাধনা-প্রার্থনাও চলেছে। গান্ধী বলতেন : ‘আমাকে দ্যাখো, আমি-ই হিন্দু-মন।’ হিন্দুত্ব ও হিন্দু বলয়ের সমর্থন বরাবরই কংগ্রেসের নেতাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে। কংগ্রেসের সভাপতি মাওলানা আবুল কালাম আজাদ তাঁর ‘ইন্ডিয়া উইন্স ফ্রীডম’ বইয়ে ভারত বিভক্তির জন্য পন্ডিত নেহেরুর হিন্দুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গী পোষণ ও হিন্দুত্বের বলয় ভেঙ্গে সর্বভারতীয় নেতৃত্বের উদারতায় তাঁর উত্তরণ না ঘটাকে দায়ী করেছেন। এ উপ-মহাদেশের মুসলিমদের সেক্যুলারিজম গ্রহণ করার অর্থ হচ্ছে, কংগ্রেসের সর্বভারতীয় জাতীয়তা, -‘যা হিন্দুত্বের মুখোশ’ মাত্র, তার কাছে ক্রমশঃ নিজেদের স্বকীয়তা ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বকে বিসর্জন দেয়ার আত্মঘাতী প্রক্রিয়া বরণ করে নেয়া।

শেখ আবদুল্লাহ আহমাদিয়া কাদিয়ানীদের ধর্মীয় বিশ্বাস পোষণ করেছেন, তা নিয়ে বিতর্কের কারণে অনেক মুসলিম নেতা তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিলেন মীর ওয়াইজ মোহাম্মদ ইউসুফ শাহ। এদিকে ১৯৩৩ খৃস্টাব্দে লন্ডনে অনুষ্ঠিত গোল টেবিল কনফারেন্সে গভর্ণমেন্ট অব ইন্ডিয়া ফেডারেশন গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। শেখ আবদুল্লাহ মনে করেন, জম্মু-কাশ্মীর যদি ভারত ফেডারেশনে যোগ দেয়, তাহলে মহারাজার পক্ষে নয়, কাশ্মীরের জনগণের পক্ষে তিনি প্রতিনিধিত্ব করবেন। ১৯৩৬ সালর ৮ মে জম্মু-কাশ্মীরে ন্যাশনাল কনফারেন্স Responsible Governmet Day কর্মসূচী পালন করে।

মীর ওয়াইজ ইউসুফ শাহ শেখ আবদুল্লাহ থেকে আলাদা হয়ে যাবার পর ১৯৩৮-এর ২৬ মার্চ শেখ আবদুল্লাহ মুসলিম কনফারেন্সে এক ভাষণে শিখ-হিন্দুদের সমন্বয়ে কাশ্মীরে একটি জাতীয়তাবাদী সেক্যুলার প্লাটফরম গঠন করে জাতীয় আন্দোলন চালানোর মত প্রকাশ করেন। প্রেমনাথ বাজাজ তাঁর মতকে সমর্থন করেন। এখান থেকেই শেখ আবদুল্লাহ মুসলিম কনফারেন্স-এর নাম পরিবর্তন করে ন্যাশনাল কনফারেন্স নামে কংগ্রেসের অদলে সেক্যুলার সংগঠন গড়ে তোলেন। ন্যাশনাল কনফারেন্সের প্রথম অধিবেশনে মুসলিম লীগ নেতাদের কোন বাণী সংগ্রহের উদ্যোগ না থাকলেও কংগ্রেস নেতা পন্ডিত নেহেরু এক বাণীতে তাঁর রাজনৈতিক সংহতি ঘোষণা করেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন : ‘‘All the world is on the move and India must move with it, not seperately or isolation. India must attain her full freedom based on unity. I hope that the Coference will view all these events that are happening in true perspective so that the people of Kashmir may attain their freedom in the larger freedom of India. [Kashamir in the Corossfire- P-109]’’

ভারতের বৃহত্তর স্বাধীনতার মধ্যেই পন্ডিত নেহেরু কাশ্মীরের স্বাধীনতাকে মূল্যায়ন করেছেন। কাশ্মীরকে ভারতভুক্ত রেখেই তিনি তাই বাণী দিয়েছেন।

১৯৪৪-এর সেপ্টেম্বর ন্যাশনাল কনফারেন্স-এর সুপুর সম্মেলনে শেখ আবদুল্লাহর ‘‘নয়া কাশ্মীর’’ মেনিফেস্টো গৃহীত হয়। এই কর্মসূচী সেক্যুলার-সমাজতেন্ত্রর মিশেল হিসেবে আলোচিত ছিল। মুসলিম ও হিন্দুদের রক্ষণশীল অংশ থেকে এই কর্মসূচীর প্রবল বিরোধিতা আসে। আই-কে-গুজরাল এবং ডিপি-ধরও তখন কাশ্মীরকেন্দ্রিক শেখ আবদুল্লাহর ‘নয়া কাশ্মীর’ আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। এঁরা দুজনই সর্বভারতীয় রাজনীতির বিশেষ স্থান দখল করেন। আই-কে-গুজরাল তো ভারতের প্রধানমন্ত্রীও হয়েছিলেন। ন্যাশনাল কংগ্রেসকে মুসলিমরা কংগ্রেসের বি-টিম হিসেবেই মূল্যায়ন করেছেন। রাজনৈতিক পরিস্থিতি তখনও শেখ আবদুল্লাহর অনুকূলে না থাকায় শ্রীনগরে দলের ম্যানিফেস্টো ছাপতে কোন প্রেস রাজী হয়নি। আই-কে-গুজরাল লাহোরে তাঁর এক বন্ধুর প্রেস থেকে এটি ছাপেন। [Inder Gujral, Interview, New Delhi, 9 April, 1994/ প্রাগুক্ত-বই-পৃ. ১১১]

‘Mother India’ (New york, 1992, P-270) বইয়ের লেখক প্রণয় গুপ্ত দাবী করেছেন যে, শেখ আবদুল্লাহর জন্ম নিয়ে কিংবদন্তী আছে। এতে একটি বিস্ফোরক তথ্য উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন : ‘‘…The substantial rumor that Sheikh Abdullah was the ellegal son of Moti Neheru.’’। পন্ডিত নেহেরুর পিতৃসূত্রে শেখ আবদুল্লাহ তাঁর ভাই।

১৯৩৭ সালে শেখ আবদুল্লাহ রাজনৈতিক ইস্যুতে পন্ডিত নেহেরুর সাথে বিস্তারিত আলোচনা করেন। লাহোর এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত এলাকায় শেখ আবদুল্লাহ এ সময় নেহেরুর সফরসঙ্গী হন। সেখানে তাঁরা ‘সীমান্ত গান্ধী’ খান আবদুল গাফফার খানের সাথে রাজনৈতিক ইস্যুতে মতবিনিময় করেন। কাশ্মীরের সেক্যুলার শেখ এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের ‘সীমান্ত গান্ধী’ গাফফার খানকে সাথে পেয়ে পন্ডিত নেহেরু মুসলিম লীগের দ্বি-জাতি তত্ত্বভিত্তিক রাজনীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক ও শক্তিশালী প্রচারণা চালান। কাশ্মীরের রাজনীতিতে কংগ্রেসের প্রভাব বৃদ্ধির লক্ষ্যে পন্ডিত নেহেরু ১৯৪০-এ [পাকিস্তান প্রস্তাব গ্রহণের সময়] খান আবদুল গাফফার খানকে নিয়ে কাশ্মীর সফর করেন। ১৯৪১ সালে গোলাম আববাস শেখ আবদুল্লাহর সাথে রাজনৈতিক সম্পর্কচ্ছেদ করে মুসলিম লীগের রাজনীতির সমর্থক হন। তিনি মীর ওয়াইজ ইউসুফ শাহের সাথে মিলে মুসলিম কনফারেন্স পুনরুজ্জীবিত করেন। এ সংগঠনটি উপমহাদেশীয় মুসলিমদের পাকিস্তান আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানায়। কাশ্মীরে মুসলিম লীগের সমর্থন থাকলেও জম্মুতে ডোগ্রা ও হিন্দুদের প্রাধান্য ছিল।

১৯৩৫ সালের দিকে ভারতীয় কংগ্রেস কাশ্মীরের ব্যাপারে তাদের নীতি অবস্থান স্পষ্ট করে। এতে তারা প্রকারান্তরে কাশ্মীরকে ভারতের ‘রাজ্য’ হিসেবেই উল্লেখ করেন। [কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি, ২৯ জুলাই-১, অগাস্ট, ১৯৩৫, আকবর রচিত, ‘বিহাইন্ড দ্য ভ্যালি, পৃ-৮১, প্রাগুক্ত-১১১]

মুসলিম লীগ নেতা মহম্মদ আলী জিন্নাহ ছিলেন সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ। তিনি শুধু কাশ্মীরের ব্যাপারেই নন, রাজা শাসিত স্বাধীন ও আধা-স্বাধীন কোন দেশীয় রাজ্যের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা বা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়ার বিরোধী ছিলেন। এমনকি ‘পাকিস্তান’ নামকরণকারী চৌধুরী রহমত আলী কাশ্মীরকে পাকিস্তনের অন্তর্ভুক্ত দেখালেও তিনি তা অনুমোদন করেননি। জিন্নাহ সাহেব তাঁর স্বচ্ছ ও নীতিনিষ্ঠ অবস্থান থেকেই বলেছেন : ‘‘We do not wish to interfare with the internal affairs of any state, for that is a matter primalrily to be resolved between the rulers and the people of the states. “[Mohammad Ali Jinnah, 17 June, 1947, Speeches and Statements, Government of Pakistan, 1989, P-17, প্রাগুক্ত, পৃ-১১২]

রাজনৈতিক দিক দিয়ে বিবেচনা করলে দেখা যায় যে, মুসলিম লীগ বা জিন্নাহ সাহেবের সাথে শেখ আবদুল্লাহর সম্পর্ক কখনও আস্থা ও ওয়ার্কিং রিলেশন্সের অবস্থায় উপনীত হয়নি। ১৯৩৫ সালে জিন্নাহ-কাশ্মীর সফরে গেলে শেখ আবদুল্লাহর সাথে তাঁর প্রথমবার সাক্ষাৎ হয়। পরবর্তী পর্যায়ে বখশী গোলাম মোহাম্মদকে নিয়ে দিল্লীতে শেখ আবদুল্লাহ জিন্নাহর সাথে রাজনৈতিক ইস্যুতে আলোচনা করেন। জিন্নাহ সাহেব ১৯৪৪ সালে শেষবারের মতো কাশ্মীর সফর করেন। শ্রীনগরের শেখ আবদুল্লাহ, জি এম সাদিক, মাওলানা মাসুদি তাঁকে ব্যাপক সংবর্ধনায় গ্রহণ করেন। ন্যাশনাল কনফারেন্সে ভাষণ দিয়ে জিন্নাহ সাহেব মুসলিম কনফারেন্সেও বক্তব্য রাখেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন : ‘‘If your objective is one, I am a Muslim and all my sympathies are for the Muslim cause.’’ [প্রাগুক্ত, পৃ, ১১২]

তবে শেখ আবদুল্লাহর সাথে জিন্নাহ সাহেবের রাজনৈতিক সম্পর্ক এরপর থেকে তিক্ততায় পর্যবসিত হয়। কংগ্রেস শেখ আবদুল্লাহর সাথে তাদের সম্পর্ক বাড়িয়ে দেয়। মুসলিম কনফারেন্সের নেতারা কাশ্মীরি ভাষাভাষী না হবার সুযোগে সর্বভারতীয় কংগ্রেসের সমর্থন-পৃষ্ঠপোষকতায় কংগ্রেসী পন্ডিতদের সহযোগিতায় শেখ আবদুল্লাহ ভারত ভাগের সময় কাশ্মীর উপত্যকার অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা হয়ে ওঠেন।

শেখ আবদুল্লাহ নিজেও জানতেন যে, কাশ্মীর ভারতের সাথে যুক্ত হলে পাকিস্তান তা কখনও মেনে নেবে না এবং তাতে কাশ্মীর হবে দু’দেশের জন্য যুদ্ধক্ষেত্র। [Abdullah, Flames, P-83]। কিন্তু তিনি কাশ্মীরের ভারতভুক্তিও ঠেকাতে পারেননি। আবার কাশ্মীরকে ভারতের সামরিক শক্তি পরীক্ষার রণাঙ্গন থেকেও মুক্ত রাখতে পারেননি। প্রতারিত হয়ে শেখ আবদুল্লাহকে দীর্ঘকাল কারাবরণ করতে হয়েছে। শেষবারের মতো শেখ আবদুল্লাহ যখন মহারাজা শাসিত কাশ্মীরের প্রতিনিধি হিসেবে পন্ডিত নেহেরুর সাথে দেখা করতে যান, তখন তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। মহারাজা হরি সিংয়ের সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত রামচন্দ্র কাক কাশ্মীর জুড়ে সামরিক শাসন জারী করেন।

কাশ্মীরের দুই শীর্ষ নেতা শেখ আবদুল্লাহ ও গোলাম আববাস কারাগারে থাকতে ১৯৪৭-এ মহারাজা হরি সিং আইনসভার নির্বাচন দেন। ন্যাশনাল কনফারেন্স নির্বাচন বর্জন করে। মুসলিম কনফারেন্স নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজয়ী দাবী করে। তারা মুসলিম লীগের রাজনৈতিক সমর্থন আশা করলে মুসলিম লীগ হাইকমান্ড দেশীয় রাজ্যসমূহের আভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ না করার নীতিগত সিদ্ধান্তে অটল থাকায় ভারত হস্তক্ষেপের ষড়যন্ত্র সফল করেছে প্রায় বিনা বাধায়। মুসলিম লীগের নেতাদের এই নিস্পৃহতাকে কাশ্মীরের জনগণ ভালোভাবে নেননি।

( চলবে )

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
  • © ২০১৪ - ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | কক্সবাজার আলো .কম
Site Customized By NewsTech.Com