1. litonsaikat@gmail.com : neelsaikat :
  2. shahjahanauh@gmail.com : কক্সবাজার আলো : কক্সবাজার আলো
  3. syedalamtek@gmail.com : syedalam :

জনসংখ্যা বাড়ছে কমছে মানুষ

  • আপডেটের সময় : শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০১৫
  • ৯ দেখা হয়েছে

ডক্টর তুহিন মালিক

এক.

ক্রমাগত গুম, খুন, ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের সাথে পাল্লা দিয়ে ক’দিন ধরে যুক্ত হয়েছে শিশুদের ওপর অমানবিক সব লোমহর্ষক হত্যাযজ্ঞ। পুরো জাতি আজ মর্মাহত, স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ, শঙ্কিত ও হতবাক। ঘরে ঘরে ভীতসন্ত্রস্ত মানুষের ক্ষোভ গগনবিদারী আর্তচিৎকারের চেয়েও ভয়াবহ। বর্বর নরপশুদের নিষ্ঠুরতা দেখে মনুষ্যত্ব আজ চরম অসহায় বিপর্যস্ত। জনমনে প্রবল প্রশ্ন, কেন এসব হচ্ছে, এ বর্বরতা থামবে কবে?

দুই.

১২ বছরের ফুটফুটে চেহারার নিষ্পাপ রাকিবকে মধ্যযুগীয় কায়দায় পায়ুপথ দিয়ে হাওয়া ঢুকিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। নাড়িভুঁড়ি আর ফুসফুস ফেটে যাওয়া রাকিব চিৎকার করে বলছিল, ‘মামা, মরে যাবো’। রাকিবের মায়াবী চেহারা ও নিষ্পাপ চোখ দেখে কেঁদে ফেলেছি। তার মৃত্যুর বর্ণনা আর বোনের আহাজারির কথা মনে পড়লেই নিজেকে সামাল দেয়া অসম্ভব হয়ে পড়ছে। কী অপরাধ ছিল রাকিবের? এক গ্যারেজ থেকে অন্য গ্যারেজে কাজ করতে যাওয়ার কারণে নাড়িভুঁড়ি ফাটিয়ে হত্যা করতে পারে শুধু নরপশুরাই।

তিন.

ক’দিন আগেই সিলেটে চুরির অপবাদ দিয়ে নিষ্ঠুরভাবে পিটিয়ে মারা হলো ছোট্ট শিশু রাজনকে। পৈশাচিকতা এমনপর্যায়ে চলে গেছে, অবুঝ শিশুর মৃত্যুদৃশ্যকে পর্যন্ত ভিডিও করে সমাজে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এ যেন মানুষ হত্যার এক মহা আনন্দযজ্ঞ! শুধু কি তাই? হত্যাকারীদের কাছ থেকে ১২ লাখ টাকার ‘স্পিডমানি’ নিয়ে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ঘাতককে সসম্মানে দেশের বাইরে চলে যাওয়ার সুব্যবস্থা করে দিয়েছে। মামলা নেয়া তো দূরের কথা, উল্টো নিহত শিশুর বাবাকে পুলিশি হৃদয়হীনতার শিকার হতে হয়।

চার.

ক’দিন আগে মাগুরা জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি সুমন সেনের হাতে মর্মান্তিকভাবে গুলিবিদ্ধ হলো মাতৃগর্ভে থাকা আট মাসের শিশু। এই হায়েনাদের কারণেই মাতৃগর্ভ পর্যন্ত আজ হারিয়েছে। শিশুটি জন্ম নিলো রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের গুলির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে। মাতৃগর্ভ থেকেই সে দেখল সমাজের নির্মম, কুৎসিত ও নিষ্ঠুর চেহারা। গুলিবিদ্ধ শিশুটি বোধশক্তি আসার আগেই যদি ন্যায়বিচার না পায়, তাহলে এই নবজাতকের কাছে পরবর্তী জীবনে রাষ্ট্রযন্ত্র কতটা মূল্যহীন বলে প্রতিভাত হবে, তা কি আমরা উপলব্ধি করতে পেরেছি?

পাঁচ.

গত সপ্তাহে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এলাকা থেকে স্যুটকেসের ভেতর পাওয়া যায় ৯ বছরের শিশুর লাশ। ক’দিন আগে রংপুরে একটি হত্যা মামলার সাক্ষীর ১৪ বছরের ছোট ভাইকে শ্বাস রোধ করে হত্যা করে লাশ ঝুলিয়ে রাখা হয়। মাছ চুরির অপরাধে বরগুনার তালতলীতে রবিউল নামে ১১ বছরের শিশুকে শাবল দিয়ে পিটিয়ে মারা হলো। নাটোরসহ বেশ কিছু জায়গায় গাছের সাথে বেঁধে শিশু নির্যাতনের ঘটনা যেন ধারাবাহিকভাবেই ঘটে যাচ্ছে।

ছয়.

বিচারহীনতার এই সংস্কৃতির বিষবৃক্ষ তো আমাদেরই অপসৃষ্টি। সরকারের সর্বোচ্চপর্যায় পর্যন্ত আজ জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে। সামান্য সমালোচনায় প্রতিনিয়ত জেলে যেতে হচ্ছে। আসলেই কি মানুষের সংখ্যা ক্রমাগতভাবে কমে যাচ্ছে? এই নির্মম, পাষণ্ড, অমানবিক সমাজ কি বাইরে থেকে অন্য কেউ এসে জন্ম দিয়ে গেছে? বিবেক আর মানবতাবোধ কি বর্বর পৈশাচিকতার কাছে হার মেনে যাবে? রাষ্ট্রের সব আয়োজন কি শুধুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার জন্য তাড়া করে ফিরবে? পুলিশবাহিনীতে হাজার হাজার লোক নিয়োগ, বেতনভাতা বৃদ্ধি, আধুনিক সব অস্ত্রশস্ত্র, রাবার বুলেট আর নির্বিচারে গুলি কি এসব বর্বর অপরাধীকে আওতাবহির্ভূত করে রাখবে? জলকামান, কমান্ডো বাহিনী, র‌্যাব-পুলিশ-বিজিবি আর যৌথ বাহিনী তাহলে কেন আমরা রেখেছি? নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা আজ কোথায়?

সাত.

দেশে আইনের শাসন পুরোপুরি বিপর্যস্ত। ক্ষমতার দাপট আর পেশিশক্তির কল্যাণে অপরাধীরা আইনের শাসনকে যখন নিজেরাই শাসন করতে থাকে, তখনই বিপর্যয় ঘটে মানবতার। নীতিবোধ নিয়ে কথা বলা সমাজে যখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়, নৈতিকতা তখন আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। অন্যায় আর তোষামোদ যখন বৈষয়িক উন্নতির একমাত্র নির্ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়, মানুষের মধ্যে তখন ন্যায়-অন্যায়ের বিভেদ খুবই সূক্ষ্ম হয়ে দাঁড়ায়। বর্বর হায়েনারা তখন পঙ্গপালের মতো হিংস্র হয়ে বেড়ে ওঠে ক্ষমতাসীনদের তর্জনী বেয়ে। মাতৃগর্ভে থাকা শিশুকে পর্যন্ত গুলি করে তারা সমাজকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, গর্ভ পর্যন্ত এখন আর তাদের হাতে নিরাপদ নয়।

আট.

মানুষ রাষ্ট্রের কাছ থেকে এই শিক্ষা নিয়েছে। মানুষ দেখছে নির্যাতন করে নিজেকে বিজয়ী করা সম্ভব। শক্তি প্রয়োগ করেও বিচারের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা যখন বিলীন হয়ে যায়, তখন সমাজে এ রকম নারকীয়তার জন্ম হয়। সর্বোচ্চপর্যায় থেকে দায়মুক্তির ঘোষণা দিয়ে বলা হয় যে, ঘরে ঘরে বেডরুম পাহারা দেয়া রাষ্ট্রের কাজ নয়। সেখানে নিষ্ঠুরতার লাইসেন্সপ্রাপ্তদের হাত কাঁপবে কেন?

নয়.

মানবিক মূল্যবোধ আপাতত অসহায় হয়ে পড়লেও মানবিকতা কখনো আত্মসমর্পণ করে না। মানবতাবোধ ঠিকই জেগে ওঠে প্রত্যুষের দীপ্তিময় সূর্যের মতো। মাতৃগর্ভে থাকা শিশুকে গুলি করা ছাত্রলীগ নেতার মতো হাজারো নরপশু যেমন সমাজে আছে, তেমনি অজস্র গার্মেন্টশ্রমিকও রয়েছে আমাদের সমাজে। যে দেশে কুকুর-বিড়ালের মতো পিটিয়ে মারা হচ্ছে নিষ্পাপ শিশুদের, যে দেশে ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই বুলেটের আঘাত নিয়ে জন্ম নেয় হতভাগা শিশু, সেখানে আরেক শিশুকে রেললাইন থেকে উদ্ধার করতে গিয়ে নিজের জীবন বিসর্জন দেয় খেটে খাওয়া পোশাকশ্রমিক আরেক সুমন। আমরা বিশ্বের সব বড় বড় ক্রিকেট শক্তিকে এখন হারাতে পারি, কিন্তু বারবার শিশু রাকিব-রাজনদের কাছে আর পরাজিত হতে চাই না।

লেখক : সুপ্রিম কোর্টের আইনজ্ঞ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ

উৎসঃ   নয়া দিগন্ত

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
  • © ২০১৪ - ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | কক্সবাজার আলো .কম
Site Customized By NewsTech.Com