প্রতিদিন উদ্ধার হয় কোটি কোটি টাকার ইয়াবা : ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে গডফাদাররা

হুমায়ুন রশিদ :
সীমান্ত উপজেলা টেকনাফ থেকে সম্প্রতি বড় বড় ইয়াবার চালান পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কিন্তু ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে পাচারকারী ও আসল ব্যবসায়ীরা। তাই আটকবিহীন এই উদ্ধার অভিযানের সফলতা ম্লান হচ্ছে। অন্যদিকে কোনোভাবেই কমছে না ইয়াবা পাচার। বরং দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে ইয়াবার আদান-প্রদান।
আগে টেকনাফে ইয়াবা ব্যবসায়ী থাকলেও সেবনকারী তেমন ছিল না। বর্তমানে সেবনকারীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। যে কারণে এলাকার সচেতন মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।
তারা জানান, এইভাবে চালান আসতে থাকলে নতুন প্রজন্মকে ইয়াবার ছোবল থেকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
জেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার। সহজেই দুই দেশের লোকজন সীমান্ত পারাপার করে থাকে। কেউ যায় বৈধভাবে। আবার কেউ অবৈধভাবে। এই সুযোগে শুরু হয় ইয়াবার আদান-প্রদান। শুরুর দিকে ইয়াবা ব্যবসা সম্পর্কে অনেকেই অবগত ছিল না। প্রায় বছর দশেক আগে এই ব্যবসার সঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জড়িয়ে পড়ে। টেকনাফের গ্রামে গ্রামে এখন ইয়াবা ব্যবসায়ী। কদিন আগেও যারা কাঠুরিয়া, রিকশাচালক, বাসচালক, দিনমজুর ও জেলে ছিল তারাও এখন ইয়াবার ব্যবসা করে কোটিপতি বনে গেছেন।
তাদের রয়েছে আলিশান বাড়ি, গাড়ি, ব্যাংক ব্যালেন্স ও বিপুল পরিমাণ ধন-সম্পদ। আবার অনেকে ইয়াবার বদৌলতে জনপ্রতিনিধিও হয়ে যাচ্ছেন। তাদের প্রতিজনের বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও রয়েছে।
ইয়াবা পাচারের সঙ্গে জড়িতদের তালিকা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে রয়েছে। তবে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে এ তালিকার কোনো বাস্তবায়ন নেই। এই কারণে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা উৎসাহ বোধ করছে। আবার অনেক ইয়াবা ব্যবসায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলায় তাদের ধরা সম্ভব হচ্ছে না। এসব কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা প্রতি মাসে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাসোয়ারা নিচ্ছেন।
রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসার কারণে ইয়াবা পাচার কমে যাবে বলে ধারণা করেছিলেন স্থানীয়রা। কিন্তু সম্প্রতি পুলিশ, বিজিবি ও কোস্টগার্ড বড় বড় ইয়াবার চালান উদ্ধার করায় তাদের এ ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। সম্প্রতি সীমান্ত উপজেলা টেকনাফের বিভিন্ন জায়গা থেকে কোস্টগার্ড, বিজিবি, পুলিশ ও র‌্যাব বড় বড় ইয়াবার চালান উদ্ধার করে চলছে। তাদের এ মালিকবিহীন পরিত্যক্ত ইয়াবা উদ্ধারকে কেন্দ্র করে এলাকায় চলছে আলোচনা ও সমালোচনা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সচেতন মহলের কাছে এ উদ্ধার অভিযান প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে।
টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রণজিত কুমার বড়ুয়া বলেন, আমি যোগদান করার পর থেকে রেকর্ডসংখ্যক ইয়াবা ও পাচারকারিকে আটক করেছি। চেষ্টা করছি ইয়াবামুক্ত একটি টেকনাফ উপহার দেয়ার জন্য।
এ ব্যাপারে র‌্যাবের মেজর মেহেদী হাসান জানান, র‌্যাবের প্রতিটি অভিযানে পূর্ব প্রস্তুতি থাকে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে যেসব অভিযান পরিচালনা করা হয়, এ অভিযানের পূর্বে দীর্ঘ আলোচনা ও পর্যালোচনাও করা হয়। প্রতিহিংসামূলক নাকি সঠিক সংবাদ দেয়া হয়েছে বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হয়। এজন্য র‌্যাবের অভিযান ব্যর্থ হয় না বলেও জানান তিনি। তবে সম্প্রতি র‌্যাবের ইউনিট হওয়ার পর থেকে ইয়াবা উদ্ধার ও পাচারকারীকে আটক করেছে আগের তুলনায় বেশি। এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।
অমাবস্যার জোয়ারেই ইয়াবার ঢল :
টেকনাফে আসন্ন অমাবস্যার জোয়ারের পূর্বেই সাগর উপকূল এবং জনপদ ও সড়কে ইয়াবার ঢল নেমেছে। পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাব পৃথক অভিযান চালিয়ে ৯লাখ ২২ হাজার ৯শ ৭৫পিস ইয়াবা উদ্ধার করেছে। এই ঘটনায় একজনকে আটক এবং ১টি সিএনজি জব্দ করা হয়েছে। ৭ অক্টোবর ভোরে টেকনাফ ২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেঃ কর্ণেল মো: আছাদুদ-জামান চৌধুরী নিজস্ব সোর্সের তথ্যের ভিত্তিতে ৩টি টহল দল মেরিন ড্রাইভ রাস্তার পার্শ্বে বিভিন্ন পয়েন্টে স্থাপিত নৌকা ঘাটে অবস্থান গ্রহণ করে। বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে পাচারকারীরা ইয়াবা ভর্তি বস্তা সাগরে ফেলে তাদের নৌকা ঘাটে নিয়ে আসে। এমতাবস্থায় তাদের নৌকা তল্লাশী করে কোন মাদক ও চোরাই পণ্য পাওয়া যায়নি। ভোরে উক্ত টহল দল নোয়াখালীপাড়া নৌকাঘাট বরাবর সাগরের মধ্যে বস্তা সাদৃশ্য একটি বস্তু দেখতে পেয়ে নৌকা নিয়ে গিয়ে বস্তাটি তীরে নিয়ে আসে। পরে বস্তাটি খুলে গণনা করে ৬ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা মূল্যমানের ২ লক্ষ ১০ হাজার পিস ইয়াবা পাওয়া যায়। এদিকে সকাল সাড়ে ৯টারদিকে দমদমিয়া বিওপির সুবেদার মোঃ আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাসের নেতৃত্বে একটি টহল দল দমদমিয়া চেকপোষ্টে যানবাহন তল্লাশীকালে সকাল সাড়ে ৯টায় কক্সবাজারগামী স্পেশাল সার্ভিস বাস (নম্বর-কক্সবাজার-জ-১১-০২৩৫) বাসটি সিগন্যাল দিয়ে থামায়। যাত্রীবিহীন সীটের নীচে পরিত্যক্ত অবস্থায় পলিথিন দ্বারা মোড়ানো একটি প্যাকেট দেখতে পায়। তা খুলে গণনা করে ৫৮ লক্ষ ১২ হাজার ৫শত টাকার ১৯ হাজার ৩শ ৭৫পিস ইয়াবা পাওয়া যায়। তা পরে উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রতিনিধি, গণ্যমান্য ব্যক্তি ও মিডিয়া-কর্মীদের উপস্থিতিতে ধ্বংস করার জন্য ব্যাটালিয়ন সদরে জমা রাখা হয়েছে। অপরদিকে একই বিওপি চেকপোস্টে দায়িত্বরত জওয়ানেরা টেকনাফ হতে কক্সবাজারগামী একটি সিএনজি (কক্সবাজার-থ-১১-৩৫৭৯) চেকপোষ্টে থামায়। তল্লাশী করতে এলে কোন যাত্রী ও চালক পাওয়া যায়নি। পরে সিএনজি তল্লাশী করে যাত্রীর সীটের পিছনে একটি ব্যাগ দেখতে পায়। তা গণনা করে ৩০ লক্ষ টাকা মূল্যমানের ১০ হাজার ইয়াবাসহ সিএনজি আটক করতে সক্ষম হয়। এই ঘটনায় সিএনজি চালককে পলাতক আসামী করে নিয়মিত মামলা দায়েরের পর জব্দকৃত ইয়াবা এবং সিএনজি টেকনাফ মডেল থানায় জমা দেওয়া হয়েছে। একইদিন সকাল ৭টায় কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নিহাদ আদনান তাইয়ান এবং টেকনাফ মডেল থানার অফিসার্স ইনচার্জ রনজিত কুমার বড়–য়ার নেতৃত্বে পুলিশের একটি শক্তিশালী দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বাহারছড়া উপকূলের নোয়াখালী পাড়ায় বঙ্গোপসাগর উপকূলের অবস্থানকারী খালি নৌকায় অভিযান চালিয়ে ২টি এবং পরিত্যক্ত অবস্থায় ২টিসহ মোট ৪টি বস্তা উদ্ধার করে। তা থানায় এনে গণনা করে ৬ লাখ ইয়াবা বড়ি পাওয়া যায়। যার বাজার মূল্য ১৮ কোটি টাকা। এই ব্যাপারে টেকনাফ মডেল থানার অফিসার্স ইনচার্জ রনজিত কুমার বড়–য়া সাংবাদিকদের জানান, এত বড় ইয়াবার চালান খালাসে কারা সংশ্লিষ্ট রয়েছে তা তদন্ত স্বাপেক্ষ পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এছাড়া সকাল পৌনে ৯টারদিকে র‌্যাব-৭ এর একটি দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে টেকনাফ পৌরসভার অলিয়াবাদে ইয়াবা মওজুদের সংবাদে একটি চৌকষ আভিযানিক দল নিয়ে ঘটনাস্থলে গেলে অলিয়াবাদে অবস্থানকারী গোদার বিলের হোছাইন বাড়ির মৃত রহমত হোছাইনের পুত্র সৈয়দ আলম (৩৬) কে আটক করে। আটক আসামীর জিজ্ঞাসাবাদে তার বসত-ঘরের ভিতরে শয়ন কক্ষে খাটের নিচে অভিনব কায়দায় লুকানো ইয়াবার একটি বস্তা উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে উক্ত বস্তা গণনা করে ৮৩ হাজার ৬শ পিস ইয়াবা বড়ি পাওয়া যায়। যার বাজার মূল্য ৪ কোটি ১৮ লক্ষ টাকা। গ্রেফতারকৃত আসামী দীর্ঘদিন যাবত বিভিন্ন মাদক চক্রের কাছ থেকে ইয়াবা সংগ্রহ করে তার বসত বাড়িতে মজুদ করে এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে পাইকারী ও খুচরা বিক্রয় করে আসছে। গ্রেফতারকৃত আসামীর বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট মাদক আইনে ব্যবস্থা গ্রহণের পর টেকনাফ মডেল থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। হঠাৎ চলমান মাদক বিরোধী অভিযানে আতংকিত জনপদে ইয়াবার ঢল নেমে আসায় পেশাজীবি, রাজনৈতিক অঙ্গন ও সচেতন মহলে অজানা আতংক ছড়িয়ে পড়ছ।

উপদেষ্টা সম্পাদক : হাসানুর রশীদ
সম্পাদক ও প্রকাশক : মুহাম্মদ শাহজাহান

নির্বাহী সম্পাদক : ছৈয়দ আলম

যোগাযোগ : ইয়াছির ভিলা, ২য় তলা শহিদ সরণী, কক্সবাজার। মোবাইল নং : ০১৮১৯-০৩৬৪৬০

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অধিদপ্তরে নিবন্ধনের জন্য আবেদিত

Email:coxsbazaralo@gmail.com