1. litonsaikat@gmail.com : neelsaikat :
  2. shahjahanauh@gmail.com : কক্সবাজার আলো : কক্সবাজার আলো
  3. syedalamtek@gmail.com : syedalam :
  4. bblythe20172018@mail.ru : traceyhowes586 :

বাংলাদেশ নিয়ে এক ভারতীয় গোয়েন্দা ( ‘র’ ) অফিসারের খোলামেলা বর্ণনা

  • আপডেটের সময় : সোমবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০১৫
  • ৪১ দেখা হয়েছে

আমান আব্দুহু

* কাভারের ছবিটি ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের বিমান ‘গঙ্গা’, একাত্তরের জানুয়ারী ত্রিশ তারিখে কাশ্মীরের শ্রীনগর থেকে উড়ার পর হাইজ‍্যাক করে পাকিস্তানের লাহোর এয়ারপোর্টে নিয়ে গিয়ে বিষ্ফোরণে ধ্বংসের পরের ছবি।

ইন্ডিয়ার আন্তর্জাতিক (এসপিওনাজ/কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স) গোয়েন্দা সংস্থা ‘রিসার্চ এন্ড এনালিসিস উইং’ বা ’র’ এর সাবেক অফিসার আর.কে. যাদব। স্পাইং ক্যারিয়ার শেষে অবসর নেয়ার পর এখন তিনি ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক বিষয়ে লেখালেখি করেন। টকশো করেন। গোপন গোয়েন্দা কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক নিয়ে ‘মিশন র’ নামে একটি বইও লিখেছেন।

এ বছর ষোল ডিসেম্বর তিনি ইংরেজিতে একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। শিরোনাম হলো “একাত্তরের বাংলাদেশ যুদ্ধঃ ‘র’ এর যে নায়কদের সম্মান করতে ভারত ভুলে গেছে”। এর ভাবানুবাদ নিচে দেয়া হলোঃ

“১৯৭১ সালের ষোল ডিসেম্বর তারিখ। পাকিস্তানী আর্মির পরাজয়ের এ দিনটিকে ভারত এবং বাংলাদেশ দু’টি দেশই বিজয় দিবস হিসেবে উদযাপন করে। অথচ এ যুদ্ধে সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা যারা রেখেছিলো, এ লড়াইয়ে সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার করেছিলো যারা, তাদের সম্পর্কে সবাই এখনো নীরব থেকে গিয়েছে। তাদের সম্পর্কে গত চৌচল্লিশটি বছর ধরে একটি কথাও বলা হয়নি। এরা হলো র এর সাহসী অফিসারের দল। আর.এর. কাও এর নেতৃত্বে এরাই ছিলেন একাত্তরের যুদ্ধের প্রকৃত যোদ্ধা। আমি বিশ্বাস করি এখন সময় এসেছে একাত্তরের যুদ্ধে এই গোপন সংস্থার অবদান সম্পর্কে দেশবাসীকে জানানোর।

একাত্তরের যুদ্ধ আসলে ছিলো দুই পর্যায়ে বিভক্ত এক ঘটনা। প্রথম পর্যায়ের যুদ্ধ ছিলো র এর পরিচালনায় গেরিলা যুদ্ধ। পরবর্তীতে ডিসেম্বরের তিন তারিখ ভারতীয় আর্মির সরাসরি অংশগ্রহণে দ্বিতীয় পর্যায়ের যুদ্ধ শুরু হয়।

১৯৭০ এ পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনের আগেই সেদেশের আর্মি, রাজনীতিবিদ এবং কূটনীতিবিদের বিভিন্ন জায়গায় থাকা র এর সোর্সরা পরিস্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছিলো, নির্বাচনে যদি শেখ মুজিবুর রহমান কোনভাবে জিতেও যায় তবু তার হাতে শেষপর্যন্ত পাকিস্তানের ক্ষমতা দেয়া হবে না। এসময় আমরা জানতে পারি পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিপুল পরিমাণ সেনা সদস্যদেরকে পূর্ব পাকিস্তানে বিমানপথে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তখন র এর প্রধান কাও ভারতের মাটির উপর দিয়ে আকাশপথ ব্যাবহারের এ সুযোগ বন্ধ করে দিতে এক নিখুঁত অপারেশনের পরিকল্পনা করেন।

১৯৭১ সালের ৩০ জানুয়ারী, র এর গোপন সদস্যরা শ্রীনগর থেকে টেইক অফ করা ভারতীয় এয়ারলাইন্সের একটি বিমান, যার নাম ছিলো গঙ্গা, সে বিমানটি হাইজ্যাক করে।

ছিনতাইকৃত সে বিমানকে তারা লাহোরে নিয়ে যায়। বিমানের সব যাত্রীকে শেষপর্যন্ত মুক্তি দেয়া হয় এবং বিমানটিতে আগুণ ধরিয়ে ধ্বংস করে দেয়া হয়। গঙ্গা ছিলো পুরনো একটি বিমান। এমনিতেই খুব শীঘ্র বিমানটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করার কথা ছিলো।

যাইহোক, বিমান ছিনতাই এর এ সন্ত্রাসী ঘটনার অজুহাতে তাৎক্ষণিকভাবে ভারতীয় সরকার ভারতের উপর দিয়ে পাকিস্তানের বিমান চলাচল নিষিদ্ধ করে। এর ফলে পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে পূর্ব পাকিস্তানের আকাশপথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। কাও এর এই গোপন অপারেশনের ফলশ্রুতিতে আকাশপথে পাকিস্তানের সৈন্য এবং সামরিক সরঞ্জাম পরিবহন ব্যাহত হয়। যদিও তারা শ্রীলঙ্কার কলম্বো হয়ে নৌপথে পরিবহন করার চেষ্টা চালাতে থাকে। কিন্তু আন্তর্জাতিক প্রতিবাদ সহ বিভিন্ন চাপে পুরো প্রক্রিয়াটি বেশ ধীর হয়ে পড়ে।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বিকেল পাঁচটায় পাকিস্তানের সামরিক শাসক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকা থেকে করাচী রওনা হন। কয়েকদিন থেকে চলে আসা রাজনৈতিক আলোচনা যখন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো, তখন ইয়াহিয়া খান পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার জন্য ঢাকা এয়ারপোর্টে পৌছান। ভারতের আকাশসীমা এড়িয়ে দুই হাজার মাইল দীর্ঘ এই বিমানযাত্রার জন্য প্রচুর নিরাপত্তার আয়োজন করা হয়।

ইয়াহিয়া খান জানতেন তিনি ঢাকায় থাকা অবস্থায় সামরিক অভিযান শুরু করলে সাথে সাথে ঢাকাতে ভারত সরাসরি হস্তক্ষেপ করে বসতে পারে। তার কাছে রিপোর্ট ছিলো র এর গোপন অভিযানে এমন কি তার মৃত্যুও ঘটতে পারে। সবমিলে পাকিস্তান বড় ধরণের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পরবে। র এর মাধ্যমে কোনভাবে আটকে যাওয়ার কিংবা ফেরার পথে ভারতের মাটিতে জোরপূর্বক অবতরণের কোন ঝুঁকি ইয়াহিয়া খান নিতে চাননি।

সুতরাং, তিনি করাচী পৌছার পরে সামরিক অভিযান শুরু করা হবে এমন পরিকল্পনা করা হলো। করাচীতে তার অবতরণ করার সংবাদ ঢাকাতে আর্মির কাছে পৌছার পরপরই রাত সাড়ে এগারোটায় বাঙালীদের উপর চালানো নৃশংস গণহত্যা শুরু হলো। এর আগে ঠিক রাত আটটার সময় র অপারেটিভরা বত্রিশ নাম্বার ধানমন্ডিতে মুজিবের সাথে দেখা করে তাকে জানিয়েছিলো যে, রাতে পাকিস্তানী আর্মি তাকে গ্রেফতার করতে আসবে। তখন মুজিব তার অনুগত নেতাকর্মীদেরকে আত্মগোপন করতে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু তিনি বাসা ছেড়ে নিজে অন্য কোথাও আত্মগোপনে যেতে রাজি হননি। তিনি ভাবছিলেন তাকে খোঁজার জন্য আর্মি পুরো ঢাকা তছনছ করে জ্বালিয়ে দিতে পারে। রাত প্রায় দেড়টার দিকে মুজিবকে গ্রেফতার করা হলো। এসময় পাকিস্তানী আর্মির এক গোপন বার্তা র ইন্টারসেপ্ট করে। এতে বলা হয়েছিলো, ‘পাখিকে খাঁচায় ঢুকানো হয়েছে’। বার্তার এ খবর সাথে সাথে ভারতীয় মিডিয়ার মাধ্যমে পুরো পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে দেয়া হয়।

পাকিস্তানী বাহিনী যখন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালীদের উপর ভয়াবহ ক্র্যাকডাউন চালাতে আরম্ভ করলো, সেখান থেকে দলে দলে আশ্রয় নিতে আসা শরণার্থীর ভীড় ভারত সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলো। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি সেনাপ্রধান স্যাম মানেক’শ এবং র প্রধান আর.এন. কাও এর সাথে বৈঠকে বসলেন।

তিনি এসময় তাদের সাথে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করার উপায় এবং কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি সেনাবাহিনী প্রধান মানেক’শকে বলেন এ অঞ্চলে পাকিস্তানী আর্মির বিরুদ্ধে ভারতীয় আর্মির অভিযান চালাতে হবে। এর উত্তরে জেনালের মানেক’শ বলেন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব সবসময়ই ভারতীয় সামরিক বাহিনীকে শিখিয়ে এসেছে যে তাদের ভূমিকা হলো প্রতিরক্ষামূলক। সেনাবাহিনীর মূল কাজ হলো নিজ দেশের আঞ্চলিক অখন্ডতা রক্ষা করা।

যদি সেসময়েই ভারতীয় বাহিনীকে পূর্ব পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়া হতো তাহলে তা বিপর্যয় ডেকে আনতো। পূর্ব পাকিস্তানের নদীনালাপূর্ণ জলজ পরিবেশে অভিযান করার মতো সরঞ্জাম এবং প্রশিক্ষণ আমাদের ছিলো না। এ কারণেই জেনারেল মানেক’শ তড়িঘড়ি করে বোকার মতো অভিযান চালাতে চাননি। এধরণের প্রিম্যাচুর অপারেশন চালানো হলে তখন ১৯৬২ এবং ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পরাজয়ের পুনারবৃত্তিই হতো।

এসব শুনে ইন্দিরা গান্ধি জেনারেল মানেক’শকে প্রশ্ন করলেন, পূর্ব পাকিস্তানে সরাসরি আক্রমণের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে আর্মির কতটুকু সময় প্রয়োজন? উত্তরে তিনি জানালেন অন্তত ছয় মাস সময় দরকার। গান্ধি জেনারেলকে দ্রুত প্রস্তুতি নিতে বললেন এবং প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়া মাত্রই তাকে জানানোর জন্য বললেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী গোয়েন্দা প্রধান কাওকে আদেশ দিলেন, আর্মির চুড়ান্ত অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরী করার জন্য যা যা করা প্রয়োজন তা যেন তখনই শুরু করা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর কাও এর নিবেদিতপ্রাণ টীম দ্রুত পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সামরিক গেরিলা প্রশিক্ষণের ব্যাবস্থা নেয়। এসময়ে কাও এর মূল শক্তি হিসেবে যেসব র অফিসার ছিলেন, তারা হলেন পাকিস্তান ডেস্কের প্রধান কে. শংকরান নায়ার, বাংলাদেশ অপারেশনের প্রধান পি.এন. ব্যানার্জি এবং টেকনিকাল ডিভিশন প্রধান ব্রিগেডিয়ার এম.বি.কে. নায়ার।

পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্তে এবং ভেতরেও অনেকগুলো মনিটরিং স্টেশন স্থাপন করা হলো। কলকাতার থিয়েটার রোডে এপ্রিলের চৌদ্দ তারিখে একটি প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হলো এবং তাদের রাজধানী হিসেবে মুজিবনগরের নাম ঘোষণা করা হলো।

মুজিবনগরে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ নামের একটি বাংলাদেশী রেডিও ষ্টেশন প্রতিষ্ঠা করা হলো। এ রেডিও ষ্টেশন থেকে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের জন্য নিয়মিত খবর প্রচার করা হতো। এসব খবরের মাধ্যমে প্রবাসী সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা এবং বিভিন্ন দূরবর্তী স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকা গেরিলা যোদ্ধাদের বিভিন্ন সাহসী ঘটনার কল্পকাহিনী নিয়মিত প্রচার করা হতো।

মুজিবের অবর্তমানে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রবাসী সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলামকে দায়িত্ব দেয়া হলো। তাজউদ্দিন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হলো। মুজিবের বিশ্বস্ত সহকারী কর্ণেল এম.এ.জি. ওসমানীকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাময়িক প্রধান ঘোষণা করা হলো। এ পদমর্যাদার অংশ হিসেবে তিনি গেরিলা যোদ্ধা এবং মুক্তিবাহিনীর প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পেলেন।

কলকাতাতে র এর জয়েন্ট ডিরেক্টর পি.এন. ব্যানার্জি বাংলাদেশের এ প্রবাসী সরকারকে নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচালনার পুরো দায়িত্ব পালন করেন। একই সাথে তিনি সেদেশের অভ্যন্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের সমস্ত গোপন এবং প্রকাশ্য গেরিলা আক্রমণ কোঅর্ডিনেট করেন। পূর্ব পাকিস্তানের বেশিরভাগ অংশে মুক্তিবাহিনী অভিযান চালাচ্ছিলো, এর বাইরে অল্প কিছু এলাকায় অন্যান্য গেরিলা বাহিনী কাজ করছিলো।

মুক্তিবাহিনী ছাড়া অন্য আরেকটি বড় গেরিলা বাহিনী ছিলো মুজিববাহিনী। এই বাহিনী র এর স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্স এস.এস.এফ. এর সরাসরি তত্বাবধানে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় অভিযান চালাচ্ছিলো। এস.এস.এফ. প্রধান মেজর জেনারেল এস.এস. উবান সরাসরি এবং ব্যাক্তিগতভাবেই পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরে চালানো সবগুলো অভিযানের তত্বাবধান করছিলেন।

পাকিস্তানের দোসর এক বিদ্রোহী মিজো নেতা লাল ডেংগাকে ধরতে গিয়েও এস.এস.এফ. ইউনিট অল্পের জন্য তা আর পারেনি। এরাই চাকমাদের হিন্দু রাজা এবং পাকিস্তানের মন্ত্রী ত্রিদিব রায়ের দুই ছেলেকে রক্ষা করে। এই রাজা এবং তার পরিবার পাকিস্তানী বাহিনীর মাধ্যমে এসময় চাকমাদের উপর এসময় চুড়ান্ত নির্যাতন চালাচ্ছিলো। সুতরাং এস.এস.এফ জানতো এরা যে কোন সময় চাকমাদের গণপিটুনিতে মারা যেতে পারে। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হাত থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে স্বাধীন করার সমস্ত কৃতিত্বই এস.এস.এফ এবং মুক্তিবাহিনীর।

এছাড়া আরেকটি উল্লেখযোগ্য গেরিলা বাহিনী ছিলো কাদেরীয়া বাহিনী। র এর অপারেটিভ কাদের সিদ্দীকী, যার ডাকনাম ছিলো টাইগার সিদ্দিীকী, তার নেতৃত্বে এ বাহিনী ঢাকায় এবং বিভিন্ন নিকটবর্তী এলাকায় পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে ত্রাসের সৃষ্টি করে। এরা বিভিন্ন যোগাযোগ ব্যাবস্থা ধ্বংস করে দেয়, সেনাবাহিনীর বিভিন্ন অংশের উপর অতর্কিত হামলা চালায়, সেনাবাহিনীর রসদ ও সামরিক সরঞ্জাম বোমা বিস্ফোরণে উড়িয়ে দেয় এবং তাদের পরিবহন করা গাড়িগুলোর উপর আক্রমণ করতে থাকে। টাইগার সিদ্দীকির বাহিনী এসময় অনেকগুলো ব্রিজ উড়িয়ে দেয়। এর ফলে পাকিস্তানী বাহিনীর চলাচল মারাত্বকভাবে বাধাগ্রস্থ হয়।

সবমিলে ভারতীয় আর্মির যুদ্ধ শুরু করার মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে শক্তিশালী পাকিস্তানী বাহিনীর তিরানব্বই হাজার সেনার আত্বসমর্পণ করার এই ঘটনা সম্ভবপর হয়েছিলো গেরিলা আক্রমণের প্রথম পর্যায় এবং শেষপর্যন্ত ভারতীয় আর্মির চুড়ান্ত অভিযানের দ্বিতীয় পর্যায়ের সমন্বিত উদ্যোগের ফলে। সাউথব্লকে প্রধানমন্ত্রীর অফিসের খুব কাছাকাছিই মানেক’শ এবং কাও অফিস ছিলো।

তাদের সবার মাঝে যোগাযোগ এবং বুঝাপড়া ছিলো খুবই শক্তিশালী, এবং এ বুঝাপড়াই ছিলো এ যুদ্ধে ভারতের বিজয়ের আসল শক্তি। কাও নিজে আমাকে একবার বলেছিলেন, তারা তখন যে কোন সময় যখনই দরকার হতো তখন একজন আরেকজনের অফিসে কোন ধরণের আনুষ্ঠানিকতা কিংবা ইতস্ততবোধ ছাড়াই ঢুকে যেতেন। এমনকি তারা অফিস সময়ের বাইরেও অনেক সময় যুদ্ধের বিভিন্ন কৌশলগত পরিকল্পনার বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে ব্যস্ত থাকতেন।

এ যুদ্ধের প্রথম পর্যায়টি ছিলো র এর পরিচালনায়, যারা এক লক্ষেরও বেশি বাংলাদেশীকে গেরিলা প্রশিক্ষণ দিয়েছিলো। এরা দ্বিতীয় পর্যায়ের চুড়ান্ত আক্রমণের আগ পর্যন্ত আট মাস যাবত পাকিস্তানী বাহিনীকে ব্যস্ত রেখেছিলো। এরপর শুরু হলো যুদ্ধের শেষ পর্যায় যখন ডিসেম্বরের তের থেকে ষোল তারিখ পর্যন্ত সরাসরি লড়াই হলো। র এর জন্য এটি এমন এক অর্জন যার কোন তুলনা পৃথিবীর অন্য কোন ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির ইতিহাসে নেই।

পুরো বিষয়টি ছিলো কাও এর পরিকল্পনা, যার অভিজ্ঞতা এবং বুদ্ধিমত্তা ছিলো অতুলনীয়। সেসময় মাত্র তিন বছর আগে র এর কার্যক্রম আরম্ভ হয়েছিলো। তাদের শক্তি এবং যন্ত্রপাতি খুব বেশি ছিলো না। তবুও কাও তার অফিসারদের সাথে নিয়ে এ বিশাল অর্জন সফলভাবে সম্পন্ন করেছিলেন। আমি তাকে যতদূর বুঝেছি, তিনি কখনো কোন কাজ অর্ধেক করাতে কিংবা অসম্পূর্ণভাবে করে রাখাতে বিশ্বাস করতেন না।

অথচ ভারতের সরকার কাও এর এইসব অবদানকে ভুলে গিয়েছে এবং যুদ্ধে এ গোপন ইন্টেলিজেন্স কমিউনিটির ভুমিকাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। যারা বাংলাদেশীদেরকে একাত্তরে সাহায্য করেছিলো তাদেরকে তারা অনেক সম্মান দিয়েছে, কিন্তু এমনকি তারাও র এর কোন অফিসারকে সম্মানিত করেনি। এ বিষয়টি আসলেই বিশাল একটি প্রশ্ন হয়ে থেকে গিয়েছে। যদিও এইসব নায়কদের অনেকেই এখন আর জীবিত নেই, এবং অনেকে অশীতিপর বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছেন।

এখনই উপযুক্ত সময়। সরকারকে তাদের রাজনৈতিক জড়তা ঝেড়ে ফেলতে হবে এবং ভারতীয় গোয়েন্দা কার্যক্রমে কাও এর অবদানকে স্বীকৃতি দিতে হবে। এর মাধ্যমে ভারতীয় ইন্টেলিজেন্স এর নৈতিক শক্তি চাঙ্গা হবে এবং ভবিষ্যত সফলতার সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।”

এ পর্যন্ত হলো র এর এক্স-অফিসার আর.কে. যাদবের লেখা। একাত্তরের যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা বাহিনীর একজন অফিসারের এ বর্ণণা থেকে কিছু বিষয় জানা যায়। এবং কিছু প্রশ্নের সৃষ্টি হয়।

১. তাদের দৃষ্টিতে প্রথম আটমাসের যুদ্ধ ছিলো র এর পরিচালিত এবং বাংলাদেশী গেরিলাদের, যাদের আমরা মুক্তিবাহিনী বলে গর্ব করি, তাদের অংশগ্রহণে গেরিলা যুদ্ধ। পরবর্তীতে তের দিন সরাসরি দুইদেশের সামরিক বাহিনীর যুদ্ধ হয়। র এর অফিসার হিসেবে তিনি নিজের ফোর্সকে মহিমান্বিত করবেন এটা স্বাভাবিক। পুরো লেখাতে পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী থেকে বিদ্রোহ করা বাংলাদেশী আর্মি অফিসারদের ভুমিকার কোন উল্লেখ নেই। যাইহোক, এ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই। আগে জানতাম শেষ তেরদিন ভারতের যুদ্ধ। এখন জানলাম আসলে একাত্তরের পুরোটাই ভারতের যুদ্ধ। বরং, তারা একাত্তরের আগে থেকেই বিভিন্ন কাজকর্ম করে যাচ্ছিলো।

২. ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের ‘গঙ্গা’ ছিলো ফকার এফটুয়েন্টি সেভেন ফ্রেন্ডশীপ বিমান। ভারতীয় বিমান সংস্থার এটি ছিলো সবচেয়ে পুরনো বিমান যা বাতিল হয়ে যাওয়ার কারণে সার্ভিস থেকে বাদ দেয়া হয়েছিলো। তবে ঘটনার কয়েকদিন আগে তা আবার চালু করা হয়। একাত্তরের জানুয়ারীর ত্রিশ তারিখে বিশিষ্ট কাশ্মীরি জিহাদী জনাব হাশিম কোরেইশী, যিনি বর্তমানে জম্মু কাশ্মীর ডেমোক্রেটিক লিবারেশন ফ্রন্টের চেয়ারম্যান, তিনি এবং তার সহযোদ্ধা আশরাফ ভাট বিমানটি হাইজ্যাক করে লাহোরে নিয়ে যান। পয়লা ফেব্রুয়ারী এক বিষ্ফোরণে বিমানটি আগুনে পুড়ে ধ্বংস হয়। স্বাভাবিকভাবেই সেসময় এটি ছিলো আন্তর্জাতিকভাবে বিশাল এক ঘটনা।

এখন জানা গেলো পুরোটা ছিলো র এর সাজানো অপারেশন। আগামী চল্লিশ পঞ্চাশ বছর পর অনেক ডকুমেন্ট যদি ডিক্লাসিফাইড হয় তখন যে কত জিহাদীর চেহারা দেখা যাবে আল্লাহ মালুম।

৩. মুজিবের সাথে র এর নিয়মিত যোগাযোগ ছিলো। অবশ্য আগেও বিভিন্ন লেখাতে এ যোগাযোগের কথা এসেছে। পাকিস্তানের একজন অন্যতম রাজনৈতিক নেতার সাথে প্রতিবেশী দেশের গোয়েন্দা সংস্থার এ ধরণের যোগাযোগ সে গোয়েন্দা সংস্থার বিশাল কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে।

৪. রাজাকার রাজা ত্রিদিব রায়ের পরিবারকে রক্ষার ঘটনা থেকে বুঝা যায় র দুই দিকেই দক্ষতার সাথে ভুমিকা রেখেছে।

৫. কাদের সিদ্দীকি র এর অপারেটিভ বা এজেন্ট। কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশনের সোর্স হওয়া এক কথা, আর সরাসরি অপারেটিভ হওয়া অন্য কথা। সোর্সরা শুধু তথ্য সরবরাহ করে। যেমন ধরেন আপনি ইয়থ ডেলিগেশনে ভারত ঘুরে আসলেন, বিভিন্নভাবে খাতির হলো। পরবর্তীতে সরকারী অফিসার হওয়ার পর আপনার মাধ্যমে তারা নিয়মিত বিভিন্ন তথ্য পেলো। কিন্তু অপারেটিভরা অর্গানাইজেশনের দেয়া বিভিন্ন এসাইনমেন্ট বাস্তবায়ন করে। সে এসাইনমেন্ট যে শুধু সন্ত্রাসী কাজকর্ম হবে এমন কোন কথা নেই। শুডো-বিরোধীতা তৈরী করাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটা এসাইনমেন্ট হতে পারে।

সাবেক র অফিসারের লেখাতে এ তথ্য জানার পর কল্পনায় একদল বিশাল ছাগল জমায়েত দেখলাম যারা কাদের সিদ্দীকির টকশো হা করে গিলছে এবং তার কলাম পড়ে উচ্ছাসে ফেটে পড়ছে। সাথে প্রশ্নের উদ্রেক হলো,

বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের মাঝে আর কারা কারা র এর অপারেটিভ আছে? যদি কেউ বাবা মারা যাওয়ার পর দীর্ঘদিন ভারতের আশ্রয়ে থাকে তাহলে তার সম্ভাবনা কতটুকু? অথবা কেউ যদি শৈশব কৈশোর পুরো সময়ে ভারতে বড় হয় তাহলে কি অবস্থা? সরাসরি অপারেটিভ ছাড়াও র এর সোর্স হিসেবে কাজ করছে এমন মানুষের সংখ্যা বাংলাদেশে কেমন?

৬. র এর অপারেটিভ আর সোর্সরা পারিশ্রমিক হিসেবে কি পায়? রাজনৈতিক নেতাদের কথা না হয় বাদ দিলাম। অনেক সময় ব্ল্যাকমেইল হয়, অনেক সময় ক্ষমতার সুবিধা। কোন ভার্সিটির ভিসির পদ অথবা কোন প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতাও হতে পারে। কিন্তু শাহবাগিদের প্রাপ্তি কি? কিছু আইফোন, কিছু ল্যাপটপ অথবা বিদেশে এসাইলামের সাহায্যতে সীমাবদ্ধ? না কি অন্যান্য আরো কিছু আছে?

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে মুক্তিযুদ্ধের কিচ্চাকাহিনীর নামে চাপাবাজির প্রসঙ্গে আজ আমরা আর না যাই। যেভাবে গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের কাপড় খুলে যাচ্ছে মনে হচ্ছে বরং উল্টা এখন জয় বাংলা বলে নিজেদের চোখ ঢাকতে হবে আর কি।

সবাইকে ভিজায় দিওয়াসের বিলম্বিত শুভেচ্ছা। ভিজায় দিন। ভিজায় থাকুন।

এই বিভাগের আরও খবর
  • © ২০১৪ - ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | কক্সবাজার আলো .কম
Site Customized By NewsTech.Com