জাতীয়লীড

বুলবুল তাণ্ডবে ১১ জেলায় নিহত ১৪

31views

কক্সবাজার আলো ডেস্ক :
ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তাণ্ডবে বিভিন্ন জেলায় অন্তত ১৪ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। দমকা হাওয়ায় গাছ ও ঘর চাপা পড়ে এবং আশ্রয়কেন্দ্রে অসুস্থ হয়ে ১১ জেলায় এ প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এ সময় আহত হয়েছেন অন্তত ৬০ থেকে ৭০জন।

নিহতদের মধ্যে খুলনায় ২ জন, বাগেরহাটে ২ জন, পটুয়াখালী ১ জন, পিরোজপুরে ১ জন, মাদারীপুরে ১ জন, ভোলায় ১ জন, শরীয়তপুরে ১ জন, বরিশালে ১ জন, গোপালগঞ্জে ১ জন বরগুনায় ২ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর বাইরে সাতক্ষীরায় আরও একজনের মৃত্যুর খবর এলেও এর সঙ্গে ঝড়ের কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানা গেছে।

এছাড়া ঝড়ে কয়েক হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে, কয়েকটি স্থানে বাঁধ ভেঙে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক গাছ উপড়ে পড়েছে।

শনিবার দিবাগত রাত থেকে রবিবার বিকালের মধ্যে ঝড়ের সময় এসব ঘটনা ঘটে।

প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর:

খুলনা: খুলনার দীঘলিয়া এবং দাকোপ উপজেলায় গাছ চাপা পড়ে দুইজনের নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। নিহতরা হলেন- দীঘলিয়া উপজেলায় সেনহাটির আলমগীর হোসেন এবং দাকোপের প্রমীলা মণ্ডল। রবিবার সকাল ১০ টার দিকে দুই উপজেলায় গাছ ভেঙে পড়ে এ মৃত্যুর ঘটনা ঘটে বলে জেলার পুলিশ সুপার এসএম শফিউল্লাহ জানিয়েছেন।

এদিকে বুলবুলের আঘাতে কয়রা উপজেলায় দেড় হাজার ঘরবাড়ি এবং দাকোপ উপজেলায় ১৭০০ ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। এছাড়া দাকোপে ৩১৫টি চিংড়ি ঘের ও ৪২৫টি পুকুর ভেসে গেছে। এই দুটি উপজেলায় শনিবার মধ্যরাত থেকে বিদ্যুৎ নেই।

বাগেরহাট: ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’র তাণ্ডবে বাগেরহাটের রামপাল ও ফকিরহাটে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে।

রবিবার দুপুরে ফকিরহাট উপজেলার বেতাগা ইউনিয়নের চাকুলী গ্রামে গাছচাপায় হিরা বেগম নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। হিরা বেগম একই গ্রামের মাসুম শেখের স্ত্রী। বাগেরহাটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক কামরুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করে জানান, নিহতের পরিবারকে ফকিরহাট উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২০ হাজার টাকা আর্থিক সহযোগিতা করা হয়েছে।

এর আগে সকালে বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার ভরসাপুর গ্রামে গাছচাপা পড়ে সামিয়া খাতুন (১৫) নামে এক কিশোরীর মৃত্যু হয়েছে। সামিয়া উপজেলার দরপোনারায়ণপুর গ্রামের বাবুল শেখের মেয়ে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তুষার কুমার পাল বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

পটুয়াখালী: পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলায় দমকা হওয়ায় গাছ উপড়ে ঘরের ওপর পড়ে হামেদ ফকির নামে এক বৃদ্ধ নিহত হয়েছেন। শনিবার রাত সাড়ে তিনটার দিকে মাধবখালী ইউনিয়নের উত্তর রামপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে বলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সরোয়ার হোসেন জানান। নিহত হামেদ ফকির পেশায় একজন মৎস্যজীবী ছিলেন।

পিরোজপুর: পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলায় প্রবল বাতাসে গাছ চাপা পড়ে ননী শিকারী নামের এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। নাজিরপুর থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান জানান, ননী শিকারীর বাড়ি নাজিরপুর উপজেলার মালিখালী ইউনিয়নের লড়া গ্রামে। রবিবরা সকালে বুলবুলের তাণ্ডব শুরু হলে গাছ উপড়ে ননীর বাড়ির ওপর পড়ে। এ সময় গাছের নিচে চাপা পরে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

এছাড়া রাজৈর উপজেলায় গাছে নিচে পড়ে ৬ জন আহত হয়েছে। অন্যদিকে চৌহদ্দি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ক্লাসরুম ভেঙ্গে গেছে।

মাদারীপুর: সদর উপজেলায় ঝড়ো হাওয়ায় ঘর চাপা পড়ে সালেহা বেগম নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। মৃত সালেহা বেগম সদর উপজেলার ঘটমাঝি গ্রামের আজাদ খাঁয়ের স্ত্রী। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুদ্দিন গিয়াস জানান, ঘূর্ণিঝড়ের সময় দমকা বাতাসে সালেহা বেগমের ঘর বাতাসে হেলে পড়ে। এ সময় ঘরের ভেতরের একটি আলমারি গায়ের ওপর পড়ে গুরুতর আহত হন সালেহা। তাকে উদ্ধার করে সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।’

বরিশাল: বরিশালে গাছের নিচে চাপা পড়ে এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। রবিবার বেলা ২টার দিকে উজিরপুর পৌর শহরের এক নম্বর ওয়ার্ডে এ ঘটনায় নিহতের নাম আশালতা মজুমদার। জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমান জানান, বুলবুল এর প্রভাবে প্রবল বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ায় একটি গাছ উপড়ে আশালতার ঘরের ওপর গিয়ে পরে। এতে গাছের নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

ভোলা: ভোলায় ঘূর্ণিঝড়ে ট্রলার ডুবে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় এখনো ১০ জন নিখোঁজ রয়েছেন।

ভোলা পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সার জানান, ইলিশা এলাকার মেঘনা নদীতে ২৪ জন জেলে নিয়ে একটি ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ১০ জন জেলে জীবিত উদ্ধার ও ১ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ১৩ জন জেলে।

ঘূর্ণিঝড় বুলবুল’র প্রভাবে ভোলায় দেড় শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। আহত হয়েছে অন্তত ২০ জন। এদের মধ্যে গুরুতর ৫ জনকে চরফ্যাসন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

এছাড়া শনিবার রাত থেকে রবিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত পর্যন্ত গোটা জেলায় ভারী বৃষ্টি এবং ঝড়ো বাতাস বইছিল। এতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অসংখ্য গাছপালা ভেঙে পড়েছে। উপড়ে গেছে বিদ্যুতের খুঁটি। বেশ কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে অতি বৃষ্টির কারণে ভোলার সদরের ইলিশা ব্রিকস, রিয়াদ ব্রিকস, মায়ের দোয়া ব্রিকস, সাবাব ব্রিকসসহ ৬৩টি ফিল্ডের কয়েক লাখ কাঁচা ইট গলে গিয়ে কয়েক কোটি টাকার ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে।

শরীয়তপুর: ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলায় ঘরের উপর গাছ পড়ে মো. আলী বক্স ছৈয়াল (৭০) নামের এক বৃদ্ধ নিহত হয়েছে। রবিবার বিকালে নড়িয়া উপজেলার ডিঙ্গামানিক ইউনিয়নের দেওজড়ি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে বলে নড়িয়া থানার ওসি হাফিজুদ্দিন জানিয়েছেন।

এছাড়াও জেলার গোসাইরহাট উপজেলায় প্রায় ৩৫০টি ঘরবাড়ি ও শত শত গাছপালা ঝড়ে পড়ে গেছে বলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানিয়েছেন।

কোটালীপাড়া (গোপালগঞ্জ): গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলায় ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তাণ্ডবে গাছ চাপা পড়ে সেকেল হাওলাদার (৭০) নামে এক বৃদ্ধ নিহত হয়েছেন। রবিবার দুপুরে ঝড়ের সময় উপজেলার বান্ধাবাড়ি গ্রামের মৃত হাসান উদ্দিন হাওলাদারের ছেলে সেকেল হাওলাদার গাছচাপা পড়ে মারা যান।

এছাড়া শতাধিক ঘরবাড়ি, পোল্ট্রি সেট বিধ্বস্ত হয়েছে। হাজার হাজার গাছপালা উপড়ে পড়েছে। বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুতের তার ছিড়ে গেছে। মৌসুমী ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে সড়কের পাশের গাছ উপড়ে পড়ে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার এস এম মাহফুজুর রহমান বলেন, ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তাণ্ডবে কোটালীপাড়ায় সেকেল হাওলাদার নামে এক বৃদ্ধের নিহত হওয়ার খবর পেয়েছি। এছাড়া এ উপজেলায় শতাধিক ঘরবাড়ি, পোল্ট্রি সেট বিধ্বস্ত হয়েছে। হাজার হাজার গাছপালা উপড়ে পড়েছে। বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুতের তার ছিড়ে গেছে। মৌসুমী ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আমরা ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয়ের কাজ করছি। আমরা ক্ষতিগ্রস্থদের সার্বিক সহযোগিতা করবো।

বরগুনা ও বামনা: ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তাণ্ডবে বরগুনা সদর ও বামনা উপজেলায় দুইজন মারা গেছেন। বরগুনা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আনিচুর রহমান জানান, বরগুনা সদর উপজেলার ৯ নম্বর এম বালীয়াতলী এলাকার ডিএন কলেজ আশ্রয়কেন্দ্রে হালিমা খাতুন (৬৬) নামে এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। তার বাড়ি সদর উপজেলার বানাই গ্রামে। হালিমা খাতুন নামের ওই নারী অসুস্থতার কারণে মারা গেছেন বলে তিনি জানান।

এছাড়া বামনা উপজেলার উত্তর কাকচিড়া গ্রামে ঝড়ের আতঙ্কে শিশীর বিশ্বাস (২৫) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। ঝড়ের সময় ছুটাছুটি করতে গিয়ে আহত হয়েছে প্রায় অর্ধ শতাধিক লোকজন।

বামনা-পাথরঘাটা, বামনা-বরিশাল ও বামনা-বরগুনা সড়কে বড়বড় গাছ উপড়ে পড়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়ায় সমগ্র বামনা এখন বিদ্যুতবিহীন রয়েছে। বেগম ফায়জুন্নেসা মহিলা কলেজের টিনসেট ভবনটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার শিউলী হরি ও বামনা থানার ওসি মো. মাসুদুর রহমান ক্ষয়গ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করছেন ও আশ্রয় কেন্দ্রে শুকনো খাবার বিতরণ করছেন।

সাতক্ষীরা: বুলবলের তাণ্ডবের পর সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায় আবুল কালাম (৬০) নামে একজনের মৃত্যু হয়েছে। শ্যামনগর থানার ইউএনও জানান, আবুল কালাম শেল্টার হোম থেকে উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের চকবারা গ্রামে নিজ বাড়িতে ফিরছিলেন। পথে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান।

Leave a Response