1. litonsaikat@gmail.com : neelsaikat :
  2. shahjahanauh@gmail.com : কক্সবাজার আলো : কক্সবাজার আলো
  3. syedalamtek@gmail.com : syedalam :

রাজনৈতিক আগ্রাসনের চেয়ে সংস্কৃতির আগ্রাসন মারাত্মক!

  • আপডেটের সময় : বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০১৫
  • ৭৪ দেখা হয়েছে
ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম
index_87934ইংরেজরা ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ এর যে সূত্র দিয়ে এদেশকে দুশ’ বছর শাসন করেছিল, ভারতের নীতিও আজ একই। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ভারত সবার মতামতকে উপেক্ষা করে যেভাবে হস্তক্ষেপ করেছে তা এখন আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। এদেশের সংস্কৃতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, তাদের নির্দেশ আর মর্জি মোতাবেকই পরিচালিত হবে। এ জন্য প্রতিটি ক্ষেত্রে এখন হ-য-ব-র-ল অবস্থা। অ-নির্বাচিত শাসকরা আজ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে।

আজ ভারতের নায়িকাদের পোশাকের নাম দিয়ে বানানো ড্রেস এর জন্য এ দেশের মেয়েরা যখন আত্মহত্যা করে! পরিবারে ভাঙন আর কলহ যখন মহামারীর রূপ ধারণ করছে ! তরুণ প্রজন্ম মাদক আর মরণব্যাধি নেশায় যখন হাবু ডুবু খাচ্ছে। তখন ও এ জাতির বুঝতে বাকি আছে আমরা কেমন আগ্রাসনের শিকার !

প্রখ্যাত রাজনৈতিক বিশ্লেষক-আবুল মনসুর আহমদ বলেছেন, “রাজনৈতিক আগ্রাসনের চেয়ে সংস্কৃতির আগ্রাসন অধিক মারাত্মক।” রাজনৈতিক আগ্রাসন হলে দেখা যায় হইচই, ডামাডোল, আর সাংস্কৃতিক আগ্রাসন নিঃশেষ করে দেয় অতি গোপনে তিলে তিলে। ভারত আজ একই সাথে দুটি অস্ত্রই ব্যবহার করছে। আমাদের রাজনীতি এখন আর রাজনীতিবিদদের হাতে নেই। আমাদের সংস্কৃতিও আর এ মাটির সাংস্কৃতিক কর্মীদের হাতে নেই। দু’চারজন যাদের দেখা যাচ্ছে এরাও দেশীয় ছদ্মাবরণে তাদের বেতনভুক্ত পোষ্য।

সংস্কৃতিক আগ্রাসন হচ্ছে যুদ্ধবীহিন বিজয়। এই অদৃশ্য যুদ্ধের সৈনিক হচ্ছে দেশীয় ভাড়াটিয়া সাংস্কৃতিক কর্মী, রাজনীতিবিদ, বুদ্বিজীবী ও মিডিয়া। এ দেশের সরকারগুলো বিশেষ করে আওয়ামী লীগের অতিমাত্রায় ভারতপ্রীতি, সংখ্যাগুরুর জনগোষ্ঠীর অসচেতনতা, হীনম্মন্যতা, নমনীয়তা, তার সাথে ভারতীয় আধিপত্যবাদীদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থের অভিলাষ এখন বাংলাদেশের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। তারা এদেশের সকল সম্ভাবনা নষ্ট করতে চায়। ভারতীয় আধিপত্যবাদের এই নগ্ন থাবা আমাদের সংস্কৃতি, সাহিত্য, জাতীয় আদর্শ ও জাতীয় ঐক্যেও সবচেয়ে বড় বাধা।

বাংলাদেশে সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বিপজ্জনক বিষয় হচ্ছে বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ। বাংলাদেশের ধর্মীয় অনুশাসনের কারণে এখানে এইডসসহ অন্যান্য অসামাজিক ব্যাধি একেবারেই কম। ভারতের অবস্থা এই দিক থেকে ভয়াবহ হওয়ায় ভারত পরিকল্পিত উপায়ে আমাদের দেশে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালাচ্ছে। উন্মুক্ত ও অনৈতিক যৌনাচার এর ফলে এইডসের মরণব্যাধির আগ্রাসন, নানা ধরনের কনসার্ট, ব্যান্ড বিশেষ করে পাশ্চাত্যের পোশাকের নামে উলঙ্গপনা আমাদের তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিয়ে যাচ্ছে।

আকাশ সংস্কৃতির নামে ডিশ অ্যান্টেনার মাধ্যমে আজকে প্রতিটি ঘরে ঘরে ব্লু-ফিল্ম (?) দিয়ে আমাদের পারিবারিক বন্ধনে দারুণভাবে আঘাত হানছে। এই অপসংস্কৃতির আগ্রাসন থেকে আমাদের সমাজের কেউ রেহাই পাচ্ছে না। ভারতীয় সিরিয়ালের আগ্রাসনের কারণে এখন অনেক পারিবারিক বন্ধন ভেঙে যাচ্ছে। পারিবারিক কলহ বাড়ছে প্রতিনিয়ত। ভারতীয় ছায়াছবি, বই ও পত্রপত্রিকা, রেডিও-টেলিভিশন, বেসরকারি টিভি চ্যানেল, অশ্লীল বিজ্ঞাপন, সংবাদপত্র, এনজিও, সাহিত্য, অশ্লীল ম্যাগাজিন ও কার্ড, ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোনে সয়লাব।

এক গবেষণায় অপরাধের কারণ ও প্রোপট অনুসন্ধানে নিম্নবর্ণিত কারণগুলো খুঁজে পাওয়া যায়- ক. অশ্লীল ও নগ্ন সিনেমা, খ. টিভি সিরিয়াল, গ. চরিত্রবিধ্বংসী অশ্লীল ম্যাগাজিন, পত্র-পত্রিকা ও বই পুস্তক, ঘ. নাইট ক্লাব ও হোটেলগুলোতে নগ্ন, অর্ধনগ্ন নারী নৃত্য ও ড্যান্স, ঙ. যৌন সুড়সুড়িমূলক পোস্টার ও ছবি, চ. যৌন উত্তেজক বিজ্ঞাপন, ছ. অর্ধনগ্ন লেবাস পরে নারীদের অবাধ চলাফেরা, জ. সহশিক্ষা, ঝ. বাজার, ক্লাব, স্কুল, কলেজ, পার্ক ও বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা এবং ঞ. মাদক ও নেশাজাত দ্রব্যের ব্যাপক প্রসার ইত্যাদি।

ভারত পরিকল্পিতভাবে এইসব বাংলাদেশে রফতানি করছে। আর এদেশে এগুলো বাজারজাত করণের দায়িত্ব পালন করছে কতিপয় সাংস্কৃতিক নামধারী প্রতিষ্ঠান, এনজিও, ভাড়াটে সাংস্কৃতিক কর্মী, কতিপয় মিডিয়া আর বহুজাতিক কোম্পানি। বাংলাদেশের অবস্থা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় তা অত্যন্ত নগ্ন, ভয়ঙ্কর, রূপ ধারণ করেছে। এই বিপদজনক অবস্থা চলতে থাকলে দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব হুমকির কবলে পড়তে পারে।

পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু তার ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া গ্রন্থে হিন্দু ধর্মকে ভারতীয় সংস্কৃতির মূল প্রবাহ বলে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও  মুসলিম দেশ হওয়া সত্ত্বেও আমাদের ক্ষেত্রে এই নীতি মানা হয় না। ইসলামই হলো বাংলাদেশের সংস্কৃতির প্রাণপ্রবাহ। আরনল্ড ম্যাথিউ বলেছেন, “পৃথিবী সম্বন্ধে যা উৎকৃষ্ট বলা বা চিন্তা করা হবে তা জানাই সংস্কৃতি।” আবুল মনসুর আহমদ সংস্কৃতির সংজ্ঞায় বলেছেন, “কালচার বা সংস্কৃতি মানুষের মন ও বিকাশের স্তরবোধক।” তাহলে একথা স্পষ্ট যে কোনো সমাজ বা জাতির মনে কোনো একটা ব্যাপারে একটা ব্যবহার বিধি, সার্বজনীন চরিত্র আচরণ বা আখলাকের রূপ পরিগ্রহ করলেই সেটাকে ঐ মানবগোষ্ঠীর কালচার বলা হয়ে থাকে।

এইচ জে লাস্কি বলেন- ÒCulture is that what we areÓ.  T S Elio:-এর মতে, ‘সংস্কৃতির দু’টি বড় চিহ্ন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ- একটি ভাবগত ঐক্য, আর দ্বিতীয়টি তার প্রকাশেত্র সৌন্দর্যের কোনো রূপ বা দিক।’ তার মতে ধর্ম সংস্কৃতির উৎস। সংস্কৃতি হচ্ছে একটি জাতির আয়নাস্বরূপ। এটা মানবগোষ্ঠীর রীতিনীতির পরিশীলিত, কর্ষিত এবং ঐতিহ্য পরম্পরাগত অনুভবের দৃঢ়তা থেকে উদ্ভূত হয়। সংস্কৃতিরও নানামাত্রিক উপাদান রয়েছে। ইসলামে যে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিকশিত হয়েছে, তার মূল উপাদান হচ্ছে তাওহীদ ও রিসালাত। ফলে ইসলামী সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বিশ্বজনীনতা, বিশ্বভ্রাতৃত্ব, বিশ্বশান্তি, পবিত্রতা, দায়িত্ববোধ ও ভারসাম্য। এগুলোর পরিপন্থী এমন কোনো উপাদান ইসলামী সংস্কৃতির অন্তর্গত হতে পারে না।

ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতির ব্যাপ্তি যেমন বিশাল, তেমনি বিশাল এর সৌকর্য ও সৌন্দর্য। স্বকীয় সংস্কৃতি হচ্ছে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবচ। কোনো জাতিকে কমজোর করে পদানত রাখতে চাইলে আগে তার সংস্কৃতিকে দূষিত ও বিনষ্ট করতে হবে। কেননা সংস্কৃতি জাতির প্রাণশক্তি, আর এই প্রাণশক্তিই জাতিকে মাথা উঁচু করে দাঁড় করায়। মূলত একটি জাতি তার স্বাধীনতার জন্য লড়াই করে, যে চেতনার বলে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন সেই চেতনাকে ভোঁতা করে দেয়। একটি জাতি কতটা সফল হয়েছে তার নিরিখে তার সংস্কৃতি স্বাধীনতার পরিমাপ করা যায়। এদিক থেকে আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের এই দীর্ঘ কালকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় স্বাধীনতার পর থেকে এ দেশে সংস্কৃতির চেতনায় বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে।

এসব অপসংস্কৃতির আগ্রাসনের মোকাবেলায় আমাদের জাতীয় আদর্শ নির্ধারণ করা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। এ দাবি পূরণে এগিয়ে আসতে হবে আমাদের সবাইকে। বুঝতে হবে আমাদের লালিত, ঐতিহ্যমন্ডিত স্বতন্ত্র মুসলিম সংস্কৃতিকে। আজ এ দেশের মানুষের প্রত্যয় হোক আগ্রাসী সংস্কৃতির বিরুদ্ধে। এজন্য আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। নতুন প্রজন্মকে তথা বর্তমান ছাত্রসমাজকে নৈতিক শিক্ষায় গড়ে তুলতে হবে। দেশীয় ও মুসলিম জাতিসত্তাকে অক্ষুণ্ন রেখে আমাদের আচার-অনুষ্ঠান পালনই রুখতে পারে অপসাংস্কৃতিক অগ্রাসন। আমাদের বর্জন করতে হবে বিজাতীয় সংস্কৃতি। বিশ্বের দরবারে মাথাউঁচু করে দাঁড়াতে হবে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি নিয়ে।

(প্রকাশিত মতামত একান্তই লেখকের নিজস্ব। শীর্ষ নিউজের সম্পাদকীয় নীতির অন্তর্ভুক্ত নয়।)

এই বিভাগের আরও খবর
  • © ২০১৪ - ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | কক্সবাজার আলো .কম
Site Customized By NewsTech.Com