ইসলামএক্সক্লুসিভকক্সবাজারটেকনাফলীড

সারাদিন রোজার পরে, ইফতার-সেহরী কেন অন্ধকারে?

57views

*রোজাদারসহ এলাকাবাসীর কঠিন প্রশ্ন!

*অতি শীঘ্রই সমস্যার সমাধান পেতে চায় তারা!

তারেকুর রহমান

টেকনাফের বাহারছড়ায় বিদ্যুৎ আসা যাওয়ার মাত্রা অতিরিক্ত হওয়ায় পবিত্র মাহে রমযান মাসে ধর্মপ্রাণ মুসলিমসহ ইউনিয়নের সর্বসাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। রমযান মাসে টেকনাফ উপজেলার পল্লী বিদ্যুৎ সেবার মান উপকূলবাসী যতটা আশা করেছিল তা না হওয়ায় ধর্মপ্রাণ মুসলমান সহ সকলেই এখন হতাশ হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ এর অসহনীয় লোডশেডিং এ অতিষ্ট হয়ে উঠেছে বাহারছড়া ইউনিয়নসহ উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়ন।

রোজাদারদের আশা ছিল বিদ্যুৎ এর লোডশেডিং থাকলেও হয়তো তারাবীহ’র নামাজ ও রাতের সময় বিদ্যুৎ সেবার মান সহনীয় থাকবে। কিন্তু ঘনঘন আসা যাওয়ার মধ্যে থাকে বিদ্যুৎ সেবার মান। রমযানের শুরু থেকেই অবস্থা প্রখর হয়ে উঠেছে। দিনের অন্যান্য সময় ছাড়াও প্রতিদিন সেহরী এবং ইফতারের সময় চলতে থাকে ভয়াবহ লোডশেডিং। এই প্রচন্ড তাপদাহ গরমের দিনে সারাদিন রোজা রাখার পর তারাবীহ’র নামাজের সময় বা রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় চরম কষ্ট পোহাতে হচ্ছে রোজাদার মুসল্লিদের, দিনে রাতে কত বার যে লোডশেডিং হয় তা হয়ত বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষও জানে না বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিদ্যুতের ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যবস্যা বাণিজ্যে ধ্বস, এছাড়াও ব্যবস্যা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিপনী বিতান, কম্পিউটার সাইবার ক্যাফগুলো প্রতিনিয়ত ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এতে সাধারণ জনগণও ব্যাপক ক্ষতির শিকার হচ্ছে।লোডশেডিংয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে বিদ্যুতের আসা-যাওয়ার এই লীলা খেলায়। শিক্ষার্থীরা জানায়, লেখাপড়া করার উপযুক্ত সময় হচ্ছে সন্ধ্যা থেকে রাত ১১ টা পর্যন্ত। অথচ ঐ সময়েই বিদ্যুৎ থাকে না। ফলে তাদের লেখাপড়া চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

শামলাপুর বাজারের স্বাদ কুলিং কর্ণারের মালিক মনসুর সওদাগর জানান, এই বাজারে আমার কুলিং কর্ণার সনামধন্য কুলিং কর্ণার হিসেবে ক্রেতার ভীড় থাকে সবসময় কিন্তু রমযান উপলক্ষে ফ্রিজের ঠান্ডা পানীয় বিক্রি করতে পারিনা, শত শত ক্রেতা হতাশ হয়ে ফিরে যায়। লোডশেডিংয়ের সাথে কম ভোল্টেজ এর কারণে  ফ্রিজে রাখা অনেক পণ্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। লোডশেডিংয়ের কারণে গরমের তীব্রতায় কুলিং কর্ণারে মানুষ বসতে চায় না। ফলে আমার ব্যবসায় ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। বিদ্যুৎ থাকলে বেচাকেনা অনেক ভালো হয় বিদ্যুৎ না থাকলে মোটেও বেচাকেনা হয়না। রমযানে প্রধান ব্যবসায় হচ্ছে পানীয় ব্যবসায়। ফ্রিজের ঠান্ডা পানি পান করতে চায় রোজাদাররা কিন্তু লোডশেডিং এর  কারণে ফ্রিজের পানীয় ঠান্ডা হয় না সাধারণ অবস্থায় থেকে যায়। সুতরাং ক্রেতারা ঠান্ডা ছাড়া সাধারণ পানীয় কিনতে চায় না। এককথায় লোডশেডিং আমার ব্যবসায় ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। এই ভয়াবহ অবস্থা থেকে আমি অতিদ্রুত মুক্তি চাই। আমার আকুল আবেদন পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের কাছে এই রমযানে অন্তত নিয়মিত বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানোর মাধ্যমে আমাদের ব্যবসায়ে একটু সহযোগিতা করতে।

শামলাপুর পুরানপাড়ার বাসিন্দা মমতাজ আহমদ জানান, ৮০ শতক জমিতে আামার সুপারী বাগান। অনেকদিন ধরে সুপারী বাগান ও বসতভিটার অন্যান্য ফলজ ও ঔষুধি গাছে পানি সেচ করতে পারছিনা । ফলে আমার ভিটায় খরার মতো অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। একটু বিদ্যুৎ আসলে মোটর পাম্প চালু করে পাম্পের নল ভিটার মাঝখানে নিয়ে যাওয়ার পথে বিদ্যুৎ আবার চলে যায়। এভাবে অনেকদিন ধরে কষ্ট পাচ্ছি আমি। এমন অবস্থা হলে তো আমরা কিছুই চাষ করতে পারবো না। লোডশেডিং আমাদের সাথে অনেক ভয়ঙ্কর ভাবে আচরণ করছে। লোডশেডিংয়ের এমন অবস্থা থেকে আমি পরিত্রান পেতে চাই।

শামলাপুর নয়াপাড়ার বাসিন্দা করিম উল্লাহ বলেন, সারাদিন রোজা রেখে ক্লান্ত অবস্থায় ইফতার করতে বসলেই বিদ্যুৎ চলে যায়, তখন খুব খারাপ লাগে। আবার কুপি জ্বালিয়ে ইফতার সেরে তারাবীহ’র নামাজ পড়তে গেলে সেখানেও বিদ্যুতের অভাব ভোগতে হয়। নামাজে দাঁড়ালে ঘামে ভিজে যায় পুরো শরীর। এরপর একটু বিদ্যুৎ থাকলেও ঠিক সেহরীর সময়ে বিদ্যুতের আর কোন দেখা নেই। গরমের মধ্যে কুপি জ্বালিয়ে সেহরী খেতে হয়। তাহলে আমরা এতো টাকা খরচ করে বিদ্যুৎ ঢুকালাম কেন বাড়িতে যদি উপযুক্ত সময়ে বিদ্যুৎ সেবা না পাই? বিদ্যুতের এমন শোষণীয় অবস্থা থেকে রেহায় পেতে চায় গ্রাহকরা।

বাহারছড়া ইউনিয়নবাসীর কষ্ট ও আক্ষেপের কথা জানিয়ে টেকনাফ পল্লী বিদ্যুৎ গ্রেড-১ কর্মকর্তা মো. এনায়েত উল্লাহ বলেন, আমরা কখনো চাই না বিদ্যুৎ নিয়ে মানুষ কষ্ট পাক। বিদ্যুৎ সেবা আমাদের কাজ। আমরা আমাদের কাজের বাইরে যেতে চাই না। বিশেষ করে অন্যান্য সময়ের চেয়ে গরমে বিদ্যুতের ব্যবহার অনেক বেশি। প্রতিটি ঘরে অফিসে অপ্রয়োজনীয় এসি, ফ্যান, বাল্ব ইত্যাদি চালু রাখে গ্রহাকরা, ফলে বিদ্যুতের ব্যবহার অনেকাংশ বেশি হয়ে পড়ে। টেকনাফ উপজেলায় বিদ্যুতের ৮টি ফিডার রয়েছে, তন্মধ্যে বাহারছড়া ইউনিয়নের ফিডারটি ৪নং। এখানে বিদ্যুতের চাহিদা ১৫ মেগা ওয়াট যা একসাথে পূরণ করা সম্ভব নয়। একসাথে ১৫ মেগা ওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে গেলে, খুব অল্প বিদ্যুৎ পৌঁছবে প্রতিটি সেক্টরে। ফলে এতে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি হবে গ্রাহকের। কারণ একসাথে সব ফিডারে বিদ্যুৎ সরবরাহ করলে প্রত্যেক ফিডারের অবস্থা নাজুক হবে। সেখানে খুব কম ভোল্টেজ হবে যা ব্যবহার করলে গ্রাহকরা আরো বেশি ক্ষতি হবে। বিদ্যুৎ বিল কিন্তু ঠিকই পরিশোধ করতে হবে। তাই আমরা ভোল্টেজ বাড়ানোর জন্য ক্রমান্বয়ে ফিডারে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে থাকি। গ্রাহকরা অভিযোগ করছেন সেহরী ও ইফতারের সময় বিদ্যুৎ থাকে না। আসলে এক্ষেত্রে বিদ্যুৎ একদম বন্ধ থাকে,  তা না। আজকে ইফতারে বিদ্যুৎ না থাকলে সেহরীর সময় অবশ্যই থাকবে, এবং কাল সেহরীর সময় না থাকলে ইফতারের সময় থাকবে। এভাবে পুরো ফিডারে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হয় আমাদের।

লাগামহীন লোডশেডিং এর বিষয়ে টেকনাফ পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের এই কর্মকর্তা আরো বলেন, লোডশেডিং বা কম ভোল্টেজের অন্যতম কারণ হচ্ছে বেটারী চালিত অটোরিক্সা ও টমটম। যে হারে এ উপজেলায় অটোরিক্সা ও টমটম বেড়ে গেছে তাতে প্রত্যেক গাড়িতে বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হলে কত বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে হয় তা গ্রাহকদের বুঝতে হবে। প্রত্যেক ফিডারে ভাগ করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হয় আমাদের। কোন ফিডারে ইফতারের সময় বিদ্যুৎ থাকলে অন্য ফিডার থেকে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করতে হয়, আবার অন্য ফিডারে বিদ্যুৎ দিলে আরেক ফিডার থেকে বিচ্ছিন্ন করতে হয় এভাবে বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করি আমরা। শুধু মাত্র টেকনাফে সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অফিসে ৩০০ ভোল্টেজ বিদ্যুৎ র্নিধারণ থাকে। ফলে এসব কর্মস্থলে বিদ্যুৎ ভালোই থাকে। তবে কোথাও ২৪ ঘন্টা নিরবচ্ছিন্ন ভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ দেওয়া সম্ভব নয়।

পবিত্র রমযান মাসে রোজা সুষ্ঠুভাবে পালন করার জন্য একটু হলেও বিদ্যুৎ সরবরাহের উন্নতি ঘটানোর জন্য ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন। লোডশেডিংয়ের কারণে বাহারছড়া ইউনিয়নে জনজীবন ভয়াবহ অবস্থায় পরিণত হয়েছে। বিদ্যুতের অনুপস্থিতে তাদের জীবন অতিষ্ঠের মেঝেতে। বিদ্যুতের এমন ভয়াবহ অবস্থা থেকে বাঁচতে চায় এলাকাবাসী। তাদের প্রশ্ন সারাদিন রোজার পরে, ইফতার-সেহরী কেন অন্ধকারে? তাদের দাবী লোডশেডিং রোধ এবং বেশি ভোল্টেজে বিদ্যুৎ দেয়া হোক। লোডশেডিংয়ের মতো ভয়ঙ্কর অবস্থা থেকে পরিত্রান পেতে চায় টেকনাফ বাহারছড়া ইউনিয়নের বাসিন্দারা।

Leave a Response