কক্সবাজারমাদকলীড

৯ শর্তে টেকনাফে ২১ জন ইয়াবাকারবারীর আত্মসমর্পণ

464views

হাফেজ মুহাম্মদ কাশেম, টেকনাফ :
টেকনাফে ২য় দফায় ২১ জন মাদক চোরাচালানী মানব পাচারকারী ও হুন্ডি কারবারীরা আত্নসমর্পণ করেছেন। অতিথিবৃন্দ তাঁদেরকে ফুল দিয়ে বরণ করেন। জেলা পুলিশের আয়োজনে কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশ ও মাদক ব্যবসায়ীদের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে তাঁরা আনুষ্টানিকভাবে আতœসমর্পন করেন। এ ঘটনায় ২১ হাজার ইয়াবাসহ ১০টি অস্ত্র উদ্ধার দেখানো হয়েছে। দীর্ঘ দিন ‘সেফহোমে’ থাকার পর ২১ ইয়াবা কারবারি সোমবার ৩ ফেব্রæয়ারি ৯ শর্তে ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আশায় আত্মসমর্পণ করেন। এর আগে দুপুর ১টার দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘সেফহোম’ থেকে শীর্ষ ইয়াবাকারবারিদের কক্সবাজার থেকে টেকনাফে আত্মসমর্পণ মঞ্চে আনা হয়। মঞ্চের কাছে টেকনাফ সরকারী ডিগ্রী কলেজের দোতলা ভবনে তাদের রাখা হয়। আত্মসমর্পণকারীদের দেখতে তাদের স্বজন ও এলাকার হাজারো মানুষ ভিড় জমান। তালিকাভুক্ত কয়েকজন ইয়াবা কারবারিকেও অনুষ্ঠানস্থলে দর্শক হিসেবে কাছে দেখা গেছে। আত্মসমর্পণকারী ২১ জন ইয়াবা ব্যবসায়ীর মধ্যে অনেকে গডফাদারও রয়েছেন। আত্মসমর্পণকৃতদের বিরুদ্ধে ইয়াবা ও অস্ত্র উদ্ধারের মামলা হবে বলে পুলিশ সূত্র জানা গেছে।
আতœসমর্পনকারীরা হলেন টেকনাফ মৌলভী পাড়ার লাল মিয়ার পুত্র আবুল কালাম প্রকাশ কালা সওদাগর (৪৯), মৃত আমির হোসেনের পুত্র আব্দুল আমিন প্রকাশ আবুল (৩৯), সাবরাং লেজিরপাড়ার মৃত হাজী মকতুল হোছনের পুত্র মোঃ ইদ্রিস (৫৭), টেকনাফ পৌর এলাকা চৌধুরী পাড়ার লামার বাজারের আব্দুল জলিলের পুত্র মোঃ ইসমাঈল (৩১), সাবরাং খয়রাতিপাড়ার আবুল কালামের পুত্র মোঃ সাদ্দাম হোসেন (২৭), মৌলভীপাড়ার সোলতান আহমদের পুত্র বশির আহমদ (৪০), সাবরাং সিকদারপাড়ার মৃত ছৈয়দুর রহমানের পুত্র আব্দুল গফুর (২৬), মৌলভীপাড়ার হাজী ফজল আহমদের পুত্র মোঃ রিদুওয়ান (২২), উত্তর লম্বরীর জহির আহমদের পুত্র মোহাম্মদ তৈয়ব প্রকাশ মধু তৈয়ব (৩৮), হ্নীলা ফুলেরডেইলের ফকির আহমদের পুত্র নুর মোহাম্মদ (২৮), হ্নীলা সিকদারপাড়ার নুর কবিরের পুত্র ঈমান হোছন (৩০), কক্সবাজার ঝিলংজা লারপাড়ার মৃত আবুল হোছন সওদাগরের পুত্র ঈমান হোছন (৪৩), টেকনাফ মৌলভীপাড়ার হাজী ফজল আহমদের পুত্র আব্দুর রাজ্জাক (৩০), হোয়াইক্যং পূর্ব মহেশখালীয়াপাড়ার মৃত নুরুল ইসলামের পুত্র শাহাদাত হোসেন (২৮), টেকনাফ মৌলভীপাড়ার ছৈয়দ হোছনের পুত্র মোহাম্মদ রাসেল প্রকাশ হাজী রাসেল (২৯), রুহুল আমিনের পুত্র ফজল করিম (২৬), পুরান পল্লানপাড়ার মৃত কামাল হোছনের পুত্র আব্দুল নুর (৩৯), টেকনাফ বিজিবি ক্যাম্প সংলগ্ন মাঠ পাড়ার ফজলুর রহমানের পুত্র মোঃ জাহেদ উল্লাহ (২৪), সাবরাং সিকদারপাড়ার হাজী আমির হোছনের পুত্র মোঃ হোসেন প্রকাশ কালু (২৮) ও হ্নীলা ঊলুচামরী কোনাপাড়ার আবুল কালামের পুত্র মিজানুর রহমান (২৩)।
৯টি শর্তগুলো হচ্ছে ১. নিজের হেফাজতে থাকা সকল ইয়াবা ও অবৈধ অস্ত্র পুলিশের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। ২. আত্মসমর্পণের আগে দায়ের হওয়া মামলা ও বিচার কার্যক্রম স্বাভাবিক নিয়মে চলবে। ৩. ইয়াবা ব্যবসায় নিজের ও পরিবারের সদস্য বা আত্মীয়-স্বজনের নামে-বেনামে অর্জিত সকল সম্পদ দুদক, সিআইডির মানি লন্ডারিং শাখা ও এনবিআরের মাধ্যমে যাচাই করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। ৪. আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ায় দায়ের হওয়া মামলায় সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে সহায়তা প্রদান করা হবে। ৫. যে সকল মাদক ব্যবসায়ী এখনো সক্রিয় তাদের ব্যাপারে তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে হবে। ৬. আইনি পক্রিয়ায় মুক্ত হলে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পাশাপাশি নিজ নিজ এলাকায় মাদকবিরোধী কর্মকান্ড করতে হবে। ৭. ভবিষ্যতে কখনো মাদক ব্যবসা সংক্রান্ত অপরাধে জড়িত হওয়া যাবেনা। ৮. আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ায় তাদের বিরুদ্ধে যে মামলা রুজু হবে, সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে তাদেরকে আইনগত সুবিধা প্রদানের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। ৯. মাদক ব্যবসার মাধ্যমে নিজের পরিবারের আত্মীয় স্বজনের নামে ও বেনামে অর্জিত সকল স্থাবর, অস্থাবর সম্পত্তি যাচাইয়ের জন্য দুদক, (সিআইডি মানিলন্ডারিং শাখা) এনবিআরসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সকল সংস্থার নিকট তাদের তথ্যাদি প্রেরণ করা হবে। সংশ্লিষ্ট সংস্থার মাধ্যমে তাদের অর্জিত সকল স্থাবর, অস্থাবর সম্পত্তি যাচাই সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
আতœসমর্পন উপলক্ষ্যে ৩ ফেব্রæয়ারী বিকাল ৩টায় টেকনাফ সরকারী ডিগ্রী কলেজ মাঠে জেলা পুলিশের আয়োজনে কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশ ও মাদক ব্যবসায়ীদের আতœসমর্পণ অনুষ্ঠান কক্সবাজার পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন (বিপিএম, বার) এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ পুলিশ চট্রগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক (বিপিএম, বার) পিপিএম। বিশেষ অতিথি ছিলেন কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত সহকারী পুলিশ সুপার ইকবাল হোছাইন, জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি এডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা, টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম সাইফ ও জেলা কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের সভাপতি সাংবাদিক তোফায়েল আহমদ।
বক্তব্য রাখেন জেলা কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সোহেল আহমদ বাহাদুর, টেকনাফ আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়ার (প্রকাশ টেকনাফ মাদ্রাসা) মুহতামিম ও শায়খুল হাদিস আল্লামা মুফতি মোঃ কিফায়ত উল্লাহ শফিক, টেকনাফ পৌর মেয়র হাজী মোহাম্মদ ইসলাম, উপজেলা কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের সভাপতি নুরুল হুদা, টেকনাফ মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ প্রমুখ। অনুষ্টান উপস্থাপনা করেন টেকনাফ সাংবাদিক ইউনিটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম সাইফী। কমিউনিটি পুলিশং কমিটি, কক্সবাজারসহ স্থানীয় মাদক বিরোধী হাজারো মানুষ ও ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। উখিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নিহাদ আদনান তাইয়ান আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান সার্বিক তত্বাবধান করেছেন। আতনসমর্পনকারীদের টেকনাফে আনার আগে প্রায় ১০ মাস ধরে আত্মসমর্পণের জন্য কক্সবাজার পুলিশ লাইনের আশেপাশের এলাকায় মধ্যস্থতাকারীর হেফাজতে থাকা ১৮ জন ইয়াবাকারবারীদের সাথে দেখা করছেন আত্মীয় স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবেরা। শীত মওসুমের কথা চিন্তা করে পরিধেয় কাপড় চোপড়, ওষুধ পত্র গুছিয়ে নিয়েছেন।
২০১৯ সালে ১৬ ফেব্রæয়ারী আত্মসমর্পণকৃত ১০২ জন ইয়াবাকারবারী আত্মসমর্পণের শর্ত মতে সরকারের কাছ কোন অনুকম্পা না পাওয়ায় অনেকে প্রস্ততি থাকা সত্বেও আত্মসমর্পণ করতে এখন অনীহা প্রকাশ করছেন বলে জানা গেছে। আত্মসমর্পণকারীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে তাদেরকে প্রনোদনা দেওয়া হতে পারে। আত্মসমর্পণের পর তাদের বিরুদ্ধে মাদক ও অস্ত্র আইনে পৃথক ২টি মামলা দায়ের করে তাদেরকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হবে। তবে এ মামলা থেকে আত্মসমর্পণকারীরা সহজে মুক্তি পেতে মামলা পরিচালনায় রাষ্ট্রপক্ষ তাদেরকে সহযোগিতা করবে। এর আগে ২০১৯ সালের ১৬ ফেব্রæয়ারি টেকনাফের শীর্ষ ১০২ ইয়াবাকারবারী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এমপি ও পুলিশের মহাপরিদর্শক ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বিপিএম (বার) এর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। এটি টেকনাফে ইয়াবাকারবারীদের ২য় দফায় আত্মসমর্পণ। সেবারের মাদক কারবারী আত্মসমর্পণ করা ছিলো এ দেশের জন্য একটা ইতিহাস ও রেকর্ড। উক্ত ১০২ ইয়াবাকরবারীর মধ্যে একজন কারাগারে মারা যান। বাকি ১০১ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযুক্তপত্র (চার্জশীট) দাখিল করে টেকনাফ মডেল থানা পুলিশ। ইয়াবাকারবারিদের আত্মসমর্পণের সুযোগ দেওয়া হলেও মাদক বিরোধী নিয়মিত অভিযানে কোনও শিথিলতা আসবেনা। বরং আরো তীব্রতর করা হবে। আত্মসমর্পণের আওতায় না এসে ইয়াবাকারবারিরা কৌশলে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করলে তাদের পরিণতি হবে আরো ভয়াবহ।
চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ৯ মাদক কারবারি নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ৬ জন রোহিঙ্গা। ২০১৮ সালের মে থেকে ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশেষ অভিযানে ইয়াবাকারবারি, ডাকাত ও সন্ত্রাসীদের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় ৫৬ জন রোহিঙ্গাসহ ২০৯ জন ইয়াবাকারবারি ও ডাকাত-সন্ত্রাসী নিহত হয় কক্সবাজার জেলায়। পাশাপাশি গত বছর ১ কোটি ৬৯ লাখ ২৬ হাজার ৫৭০ পিস ইয়াবাসহ ২ হাজার ৩৩৮ জনকে আটক এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করেছে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক বলেন, ‘যারা দেশকে ভালবাসেন তাদের উদ্দেশ্য করে আমি কিছু কথা বলতে চাই। বাংলাদেশ থেকে বছরে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা মাদকের মাধ্যমে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারে পাচার হয়ে যাচ্ছে। যারা এখনো মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন তাদের পরিণতি ভয়াবহ হবে। টেকনাফে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের প্রতিহত করতে হবে। প্রশাসনকে আপনারা সহযোগিতা করলে মাদক ব্যবসা অচিরে বন্ধ হয়ে যাবে। পরিবার ও স্বজনদের নিয়ে সাথে থাকতে চাইলে মাদক ছেড়ে ভালো পথে চলে আসুন। টেকনাফ উপজেলায় যে প্রকল্প প্রধানমন্ত্রীর হাতে নিয়েছেন আগামীতে এখানে কোন যুবক বেকার থাকবে না।কাজ করতে গিয়ে কোন মাদক ব্যবসায়ী যদি কমিউনিটি পুলিশিং এর সদস্যদের উপর হাত তুলে তখন আমি মনে করবো তারা আমার পুলিশের গায়ে হাত দিয়েছে।তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে’।

Leave a Response